ঐতিহাসিক শহর গোবরডাঙা
গোবরডাঙা অর্থাৎ ‘গো–বর–ডাঙা’। ‘গো’ শব্দের একটি অর্থ পৃথিবী, ‘বর’ মানে শ্রেষ্ঠ, এবং ‘ডাঙা’ শব্দটি সাধারণত উঁচু জায়গা বোঝাতে ব্যবহৃত হয়। অর্থাৎ, গোবরডাঙা শব্দের আক্ষরিক অর্থ পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জায়গা। প্রসঙ্গত, মূল গোবরডাঙা শহরটি যে আশেপাশের অঞ্চলের তুলনায় বেশ উঁচু তার প্রমাণ পাওয়া যায় ২০০০ সালের ভয়াবহ বন্যাতেও গোবরডাঙা সংলগ্ন অন্য সব এলাকা জলমগ্ন হলেও গোবরডাঙা শহরে জল না ওঠার ঘটনায়।
গোবরডাঙা স্টেশনটি শিয়ালদহ থেকে ৫৮ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। ব্রিটিশ আমলে এই স্টেশনটি তৈরি হয়েছিল গোবরডাঙার তৎকালীন জমিদারদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তখন এই রেলপথ ‘ইস্টার্ন বেঙ্গল রেলওয়েজ’–এর অন্তর্গত ছিল। ‘বেঙ্গল ডিসট্রিক্ট গেজেটিয়ার∶ টোয়েন্টি ফোর পরগনাস’–এর তথ্য অনুযায়ী, ‘Gobardanga— At the town of that name, a station on the Eastern Bengal State Railway, in the north-east of the district, 36 miles from Sealdah. It was founded in December 1860 by the Mukherji family, zamindars Gobardanga and was withdrawn from Government supervision in 1889’।
গোবরডাঙা স্টেশন নিয়ে মজার কিছু ইতিহাস আছে। গোবরডাঙার জমিদারদের প্রভাব-প্রতিপত্তি সম্পর্কে অনেকেই জানেন। কিন্তু এই জায়গার জমিদারদের হস্তীপ্রীতির কথা অনেকেই হয়তো জানেন না। এই নিয়ে একটা প্রবাদও এক সময় লোকের মুখে মুখে ফিরত, “টাকির লাঠি আর গোবরডাঙার হাতি।” গোবরডাঙায় পুরনো জমিদারবাড়িতে ‘পিলখানা’ নামে একটি জায়গাও আছে। এই পিলখানা মানে হল হাতি রাখার স্থান। এই হাতির সাথে জড়িয়ে রয়েছে গোবরডাঙার ‘সাড়ে তিন নম্বর’ প্ল্যাটফর্মের ইতিহাস।
সাড়ে তিন নম্বর প্ল্যাটফর্ম শুনলেই কেমন যেন অবাক লাগে। অনেকের হয়তো মনে পড়ছে হ্যারি পটার সিরিজের সেই নম্বর প্ল্যাটফর্মের কথা। না, গোবরডাঙার এই সাড়ে তিন নম্বর প্লাটফর্মটি কোনও অদ্ভুতুড়ে প্ল্যাটফর্ম নয়। এর পেছনে আছে এক ইতিহাস।
কাহিনীটি অনেকটা এরকম— গোবরডাঙার জমিদারদের হস্তীপ্রীতির কথা ঢাকার নবাবের কানে পৌঁছালে, তিনি অতি সত্বর কয়েকটি ভাল মানের হাতি চেয়ে বসেন। কিন্তু এত তাড়াতাড়ি হাতি পাঠানো যাবে কীভাবে! তখন গোবরডাঙার তৎকালীন জমিদার ব্রিটিশ সরকারের স্মরণাপন্ন হন। সেই সময় দমদম থেকে বনগাঁ হয়ে খুলনা জেলা পর্যন্ত নিয়মিত রেল চলাচল করতো। ঠিক করা হয় যে, সেই মালগাড়িতেই যাবে হাতি, কিন্তু বিশাল আকৃতির হাতিগুলোকে ওঠানো হবে তো যে সে কাজ না! তাই অনেক ভেবে শেষ পর্যন্ত তিন নম্বর প্ল্যাটফর্মের উল্টো দিকের ফাঁকা জায়গায় তৈরি করা হয় ‘এলিফ্যান্ট প্ল্যাটফর্ম’, যার দৈর্ঘ্য ছিল মূল স্টেশনের এক-তৃতীয়াংশের মতো। পরবর্তীকালে এটিই লোকমুখে ‘সাড়ে তিন নম্বর প্লাটফর্ম’ নামে পরিচিতি লাভ করে। যদিও বর্তমানে রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আগাছা ও ঝোপঝাড়ের জঙ্গলে চেনাই যায় না যে এরকম একটি গল্প লুকিয়ে আছে সেখানে।
এই শহরের ইতিহাস অত্যন্ত সুপ্রাচীন ও সমৃদ্ধ। ইতিহাস ঘেঁটে জানা যায় যে, সুদূর অতীতে গোবরডাঙা অঞ্চলটি কুশদহ বা কুশদ্বীপের অন্তর্গত ছিল। এই কুশদ্বীপের মধ্য দিয়ে বাহিত হতো যমুনা নদী। নদীটি এখনও আছে, কিন্তু নব্যতা হারিয়ে ক্ষীণকায়া হতে হতে মৃতপ্রায়। গোবরডাঙার বিখ্যাত গোষ্ঠবিহার উৎসব বা পয়লা বৈশাখের মেলা, এখনও হয় এই নদীর তীরেই। স্থানীয় লোকমুখে প্রচলটি কথা অনুযায়ী, এই নদী দিয়ে অতীতে জমিদার বাড়ির সাথে বাণিজ্য হতো পার্শ্ববর্তী অঞ্চলের, বড় বড় নৌকায় করে ব্যবসায়ীরা বিভিন্ন পসরা সাজিয়ে হাজির হতেন এই মেলায়। স্থানীয় মানুষেরা বলেন, এক সময়ে এই উৎসবে ক্ষ্যাপা ষাঁড়ের সামনে অসহায় শুকরছানা ফেলে হত্যার নৃশংস প্রথা চালু ছিল, এখন অবশ্য সে সব নেই। এই যমুনা নদীর তীরে ছিল অনেক চিনির কল, পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে আখের চাষ ও ফলন বেশি হওয়াই এই চিনির কলগুলির সমৃদ্ধি লাভের কারণ। খাঁটুরার উত্তর পাড়াতে লবণ কারখানাও ছিল। এই অঞ্চলে নীলচাষ হতো এবং সরকার পাড়ায় নীলকুঠির ধ্বংসাবশেষও দেখেছেন অনেকে। প্রসঙ্গত, সরকার পাড়ার পাশে কুঠিপাড়া নামের একটি জায়গা আছে এবং সরকার পাড়ায় ‘সরকারপাড়া – কুঠিপাড়া শাখা পোস্টঅফিস’ নামে একটি পোস্ট-অফিসও আছে। এই কুঠিপাড়ার নামটাও নীলকুঠি থেকেই এসেছে। ইতিহাসে তিতুমিরের সাথে ইংরেজদের লড়াইয়ে ইংরেজদের সহযোগী হিসাবে গোবরডাঙার তৎকালীন জমিদার কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের নাম পাওয়া যায়। এক্ষেত্রে আর একটা কথা জেনে রাখা উচিত, অতীতে গোবরডাঙার এক ব্যবসায়ী মঙ্গলচন্দ্র আঁশের পুত্র লক্ষণচন্দ্র আঁশ অর্থের বিনিময়ে কোনও এক ঘোষবাবুর কাছ থেকে বাগদার মঙ্গলগঞ্জের জমিদারির কিনে নিয়ে সেখানকার মালিক হন। পরবর্তীতে তিনিই ইংরেজ কোম্পানির সহায়তায় মঙ্গলগঞ্জে নীলকুঠি তৈরি করেন।
আদি বাসিন্দাদের পরিবারের অনেকে জানাচ্ছেন যে, গোবরডাঙার বেশিরভাগ মানুষ এসেছিলেন ওপার বাংলার সপ্তগ্রাম থেকে। সুতরাং, এই জনপদের ইতিহাস চারশো বছরেরও বেশি পুরনো তো হবেই। তবে গোবরডাঙা পুরসভার ইতিহাস অত পুরনো না হলেও, তাও প্রায় দেড়শ বছর হতে চলল। ১৮৭০ সালে, আরও বিশদে বললে, ১৮৭০ সালের ২০ই এপ্রিল মাত্র চারটি (অধুনা সতেরোটি) ওয়ার্ড নিয়ে গোবরডাঙা পুরসভা গঠিত হয়। এই পুরসভার দক্ষিণ ও পশ্চিমে রয়েছে যমুনা নদী, পূর্ব দিকে রয়েছে কঙ্কনা বাওর, যেটি একটি অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদ ও রত্না খাল, উত্তরে ইছাপুর খাল। তৎকালীন জমিদার সারদাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় গোবরডাঙা বাজারের কাছে পুরসভার প্রথম ভবনটি তৈরি করেন। নবগঠিত সেই পুরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হন খাঁটুরার বাসিন্দা একাধারে সাহিত্যের অধ্যাপক ও সমাজ সংস্কারক শ্রীশচন্দ্র বিদ্যারত্ন। তাঁর আরও একটি পরিচয় আছে, তিনি ছিলেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের সহযোগী। ১৮৫৬ সালের ২৬শে জুলাই বিধবা বিবাহ আইন পাশ হলে, শ্রীশচন্দ্র সমস্ত সামাজিক নিয়ম ও সংস্কার, এমনকি মায়ের নিষেধ উপেক্ষা করে ওই বছরের ৭ই ডিসেম্বর তারিখে বর্ধমানের পটলডাঙার লক্ষ্মীমণি দেবীর দশ বছরের বাল্যবিধবা কন্যা কালীমতীকে বিবাহ করেন। বিবাহ অনুষ্ঠানটি যদিও গোবরডাঙায় অনুষ্ঠিত হয়নি, হয়েছিল কলকাতায় রাজকৃষ্ণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের সিমুলিয়ার সুকিয়া স্ট্রিটের ১২ সংখ্যক ভবনে। এই বিবাহ নিয়ে একটি মজার গল্প প্রচলিত আছে। ‘সংবাদ প্রভাকর’ অনুযায়ী, লক্ষ্মীমণি দেবী নাকি পাত্রের ‘চক্রাকার রূপচাঁদের মোহন মন্ত্রে মুগ্ধ’ হয়ে তাঁকে কন্যা সম্প্রদান করেন। আর ‘কড়ি দে কিনলেম, দড়ি দে বাঁধলেম, হাতে দিলেম মাকু, একবার ভ্যা করতো বাপু’— মহিলাদের এ জাতীয় আবদার বা নির্দেশে বরবাবাজি শ্রীশচন্দ্র নাকি ‘ভ্যা ও করিয়াছিলেন।’ এহেন ঘটনাবহুল সেই বিবাহ ছিল প্রথম বিধবা বিবাহ। সেই বিবাহ অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন স্বয়ং বিদ্যাসাগর মশাই থেকে শুরু করে প্যারিচাঁদ মিত্র, ‘হুতুম প্যাঁচা’ কালীপ্রসন্ন সিংহ, রামগোপাল ঘোষ, দিগম্বর মিত্রের মতো তৎকালীন কলকাতার প্রথিতযশা ব্যক্তিবর্গ। পরবর্তীতে শ্রীশচন্দ্র তাঁর মায়ের স্মৃতিতে চণ্ডীতলায় জোড়া শিবমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন, সম্প্রতি গোবরডাঙার ‘হেরিটেজ’ তকমা পাওয়া স্থানগুলির মধ্যে এই জোড়া শিবমন্দিরটিও স্থান পেয়েছে। জোড়া শিবমন্দিরটি ছাড়া আর যে স্থান বা স্থাপত্যগুলিকে রাজ্য হেরিটেজ কমিশন ‘হেরিটেজ’ হিসাবে ঘোষণা করেছে, সেগুলি হল— প্রসন্নময়ী কালীমন্দির, সিংহ দুয়ার, নহবতখানা ও গোবরডাঙার খাঁটুরা হাইস্কুল।
গোবরডাঙার ইতিহাস জানতে গেলে, এখানকার জমিদার বাড়ির ইতিহাস জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অবিভক্ত ভারতবর্ষের যশোহর জেলার সারসা গ্রামের বাসিন্দা ছিলেন জনৈক শ্যামরাম মুখোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন গাইঘাটার ইছাপুরের চৌধুরী বংশের জামাই। তাঁর পুত্র হলেন খেলারাম মুখোপাধ্যায়। ইছাপুরের মামার বাড়িতে তিনি প্রায়ই আসতেন। যশোহর জেলার কালেক্টর হিঙ্কল সাহেবের সেরেস্তার কাজে নিযুক্ত ছিলেন তিনি এবং সেই কালেক্টর সাহেবের পরামর্শে পরিশোধযোগ্য অর্থে গোবরডাঙা নিলামে। এভাবেই তাঁর হাত ধরে গোবরডাঙায় জমিদার বংশের পত্তন হয় এবং সূচনা হয় গোবরডাঙা জমিদারি। লোকমুখে প্রচলিত, খেলারাম মুখোপাধ্যায় নিঃসন্তান থাকা অবস্থায় স্বপ্নে মা কালীর আশীর্বাদ প্রাপ্ত হন এবং তাঁর অব্যবহিত পরে যমুনা নদী থেকে একটি কষ্ঠীপাথর পান। তারপরেই ১৭৯৪ খ্রিষ্টাব্দে (বাংলা ১২০১ বঙ্গাব্দ) খেলারামের স্ত্রী দ্রৌপদী দেবী একটি পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। কালী মায়ের প্রসন্নে হওয়ায় খেলারাম তাঁর ছেলের নাম রাখেন কালীপ্রসন্ন। তারপর থেকেই বংশের প্রত্যেক ব্যক্তির নামের সাথে ‘প্রসন্ন’ শব্দটি যুক্ত হয়ে আসছে। এরপর তিনি বেনারস থেকে কারিগর আনিয়ে সেই কষ্ঠীপাথর কাটিয়ে স্বপ্নে দেখা দেবী মায়ের আদলে মূর্তি প্রতিষ্ঠা করে কালীমন্দির তৈরির কাজ শুরু করেন, কিন্তু শেষ হওয়ার আগেই তাঁর জীবনাবসান হওয়ায় সেই অসমাপ্ত কাজ পরবর্তীতে ইং ১৮২২ সালে (বাংলা ১২২৯ বঙ্গাব্দ) শেষ করেন তাঁর পুত্র কালীপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায় এবং সাথে বারোটি শিবমন্দির স্থাপন করেছিলেন। এই প্রসঙ্গে এও জানা যায় যে, রানি রাসমণি একবার নাকি এই অঞ্চল দিয়ে যাওয়ার সময় কালীপ্রসন্নের তৈরি এই মন্দিরে এসেছিলেন এবং এই মন্দিরের আদলটি তাঁর ভাল লাগে। পরবর্তীতে এই মন্দির প্রতিষ্ঠার ৩৩ বছর পরে দক্ষিণেশ্বরে বারোটি শিবমন্দির সহ ভবতারিণী মায়ের মন্দির প্রতিষ্ঠা হয়, যেটি হবহু গোবরডাঙার এই কালীমন্দিরের মতো, কেবল আকারে অনেকটা বড়।
এই জমিদারবাড়ির দুর্গাপুজোও প্রায় তিনশ বছরের পুরনো। শোনা যায় এককালে মোষ বলি হতো, পরবর্তীতে কালীপুজোতে পাঁঠাবলি শুরু হয়, কিন্তু ১৯৯৭ সাল থেকে সবরকম বলি প্রথা বন্ধ। বর্তমানে চালকুমড়ো ও আখ বলি দিয়ে নিয়ম রক্ষা হয়। পৃথিবীকে ঠাণ্ডা করার উদ্দেশ্যেই নাকি দেওয়া হয় আখ বলি।
আধুনিক ঘড়ির চল হওয়ার আগে, সূর্যের অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে নির্ণয় করা হতো সময়। একে বলা হতো সূর্য-ঘড়ি। গোবরডাঙাতেও ছিল এমন একটি ঘড়ি। ১৮৬৮ সালে, অর্থাৎ আজ থেকে দেড়শ বছরেরও বেশি আগে, তৎকালীন জমিদার সারদাপ্রসন্ন মুখোপাধ্যায়ের আমলে সাধারণ মানুষের সুবিধার্থে তৈরি করা হয়েছিল এই সূর্য-ঘড়ি। তৎকালীন শিক্ষা সচিব ও বিশিষ্ট গণিত বিশারদ হলিডে সাহেব এই কাজে বিশেষ সহযোগিতা করেন।
কথায় আছে, “সময় চলিয়া যায়, নদীর স্রোতের প্রায়”। সময়ের সাথে সাথে প্রতি অবহেলার বহরও বেড়েছে ঐতিহাসিক এই ঘড়িটির প্রতি, ঠিক যেন মানব জীবনের এক নিষ্ঠুর প্রতিচ্ছবি।
তথ্যসূত্র –
১) আনন্দবাজার পত্রিকা
২) বর্তমান পত্রিকা
৩) সংবাদ প্রতিদিন
৪) এই সময় পত্রিকা
৫) News 18 বাংলা চ্যানেল
৬) লোকমুখে প্রচলিত স্থানীয় মানুষের কথা
