নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (পর্ব-১)
সহকর্মী বন্ধু অনির্বাণ যখন জিজ্ঞাসা করল, “আমরা কুম্ভে যাচ্ছি। যাবে নাকি? আর দু’তিনটে টিকিট আছে মাত্র।” ‘আমরা’ অর্থাৎ, অনির্বাণ আর ওর এক বন্ধু−সৌভিক।
তারপরে যে সিদ্ধান্তটা নিলাম, সেটা সম্ভবত আমার নেওয়া এখনও পর্যন্ত দ্রুততম সিদ্ধান্ত। অনির্বাণ জিজ্ঞাসা করার কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই বললাম, “চলো তাহলে ঝুলে পড়ি তোমাদের সাথে।”
সেই মতো টিকিটও কেটে নিলাম সাথে সাথে। আর আমার সাথে ঝুলে পড়ল আমার এক অন্তরঙ্গ বন্ধু রাজীব।
অফিস শেষে বাড়ি ফিরতে ফিরতে ভাবছিলাম যে, আমার সাথে তথাকথিত ধর্ম পালনের কোনও সম্পর্ক নেই। অথচ সেই আমিও শেষ পর্যন্ত মহাঅমৃতকুম্ভে যাচ্ছি!
বাড়িতে এসে বলতেই সবাই তো অবাক। বলা নেই কওয়া নেই, হঠাৎ কুম্ভে! তবে কুম্ভ বলেই হয়তো মনে মনে খুশিও হলেন বাড়ির লোকজন, বিশেষত আমার ধর্মপ্রাণা জননী। হয়তো ভাবলেন, “যাক! অবশেষে ছেলের ধম্মে মতি হয়েছে তাহলে।“
তিনি যেমন ভাবে ভেবে খুশি থাকেন, তেমন ভাবুন। আমি আমার পথে চলি।
যাত্রা শুরু হল সতেরোই ফেব্রুয়ারি। শিয়ালদা থেকে বেলা পাঁচটার বিকানির এসি দুরন্ত এক্সপ্রেসে ছিল আমাদের টিকিট। চারজনের মোটামুটি একই জায়গায় সিট ছিল। নামব সাবেক মোঘলসরাই স্টেশন অর্থাৎ অধুনা পণ্ডিত দিন দয়াল উপাধ্যায় স্টেশনে। বেশ আনন্দ করতে করতেই পথ চলছি। আমরা চারজনে সবাই সবাইকে যে চিনতাম না, তা মনেই হচ্ছে না। উল্টে, কতদিনের যেন চেনা এই ভেবে এমন আসর জমিয়েছি যে আশেপাশের লোকজনও যেন বিরক্তি মিশ্রিত চোখে তাকাচ্ছিল।
যাই হোক, তারপর সময়মত বাড়ি থেকে আনা লুচি রুটি চানা মশলা আলুভাজা মিষ্টিসহযোগে বেশ জমিয়ে খাওয়া দাওয়া করে নিজেদের জন্য নির্দিষ্ট আপার সিটে উঠে লম্বা হলাম। ট্রেন ঢুকবে মাঝরাতে, দেড়টা নাগাদ। তার আগে যদি একটু ঘুমিয়ে নেওয়া যায়। পরের সারাদিনটা কীভাবে কাটবে, কোথায় মাথা গুঁজব কেউ জানি না। তাই আজ অন্তত কয়েকঘণ্টার ঘুমও খুব জরুরি।
ট্রেনের দুলুনিতে বেশ ঘুমিয়েও পড়লাম। একটানা ট্রেন চলছিল বলে ঘুমের অসুবিধা তেমন হয়নি। ট্রেন থামলে দেখেছি আমার ঘুম ভেঙে যায়। যাই হোক, একটা নাগাদ আমাদের অ্যালার্ম দেওয়া ছিল মোবাইলে। উঠে পড়লাম সেই মতো। ব্যাগ নিয়ে নীচে নেমে দরজার মুখে দাঁড়ালাম। ট্রেন একদম সঠিক সময়ে চলছে। বেশ আনন্দেই ছিলাম। তাই আমাদের মাথা থেকে বেরিয়ে গেছিল যে আমরা ভারতীয় রেলের যাত্রী। ট্রেন চলতে চলতে মোঘলসরাই স্টেশনের আগে হঠাৎ দাঁড়িয়ে পড়ল এবং দাঁড়িয়েই রইল এক ঘণ্টার ওপরে। তারপর অবশেষে যখন স্টেশনে পৌঁছাল তখন প্রায় তিনটে বাজে।
মোঘলসরাই স্টেশন থেকে অনেকগুলো কুম্ভ মেলা স্পেশাল ট্রেন চলছে ঘন ঘন। কিন্তু আমরা ট্রেনের ঝামেলায় আর গেলাম না। এলাহাবাদ স্টেশনে শুনলাম খুব ভিড় হচ্ছে। তারমধ্যে ভিড়ে পদপিষ্ট হওয়ার ঘটনাও ঘটছে কুম্ভমেলাকে কেন্দ্র করে, তাই আমরা অযথা ঝুঁকি নিতে চাইলাম না। মোঘলসরাই স্টেশনেও থিকথিকে ভিড়। আমরা ভিড় ঠেলে স্টেশনের বাইরে এসে পঞ্চাশটাকা মাথাপিছু ভাড়া দরে অটো ভাড়া করে বারাণসীর উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। সেখান থেকে বাস ধরে যাব কুম্ভমেলায়। রাতের অন্ধকারে চলেছি আমরা। শীতের রাতে খোলামেলা অটোয় বেশ কাঁপুনি লাগছে। মোঘলসরাই থেকে বারাণসীর দূরত্ব মোটামুটি কুড়ি কিলোমিটার। ফাঁকা রাস্তা ধরে ছুটেছে আমাদের অটো। আধঘণ্টার মধ্যে পৌঁছে গেলাম আমাদের আপাত গন্তব্যে। বাসস্ট্যান্ড থেকে একের পর এক বাস ছাড়ছে। আমরা চা খেয়ে উঠে পড়লাম একটা বাসে। ফাঁকা বাস। পরপর বাস ছাড়ছে বলেই হয়তো ফাঁকা। জানালার ধারে জমিয়ে বসলাম। যেতে প্রায় তিনঘণ্টা লাগার কথা। আর রাস্তায় জ্যাম থাকলে তো এলাহি ভরসা।
একটানা বাস চলছিল। ঝিমুনি এসে গেছিল একটু। হঠাৎ ধপ করে একটা শব্দ শুনে ঘুমটা ভেঙে গেল। পেছনে তাকিয়ে দেখি সৌভিক সিটের নীচে বাসের মেঝেতে পড়ে আছে। কী হল ব্যাপারটা! বুঝলাম অচিরেই। ফাঁকা সিটে টানটান হয়ে শুয়ে ছিল সৌভিক। বাসের ঝাঁকুনিতে সিট থেকে সোজা পপাত চ! তারপরে অবাক হয়ে চেয়ে দেখলাম বাসের সিটের ওপর রাখা গদিটা খুলে নিয়ে নীচে পেতে সটান শুয়ে পড়ল চাদর মুড়ি দিয়ে। ঘুমের সাথে কোনোরকম আপস নয়। সত্যিই বাঙালি বটে!
আমিও আবার বাসের সিটে গা এলিয়ে দিলাম। বাস এগিয়ে চলছে। ওঠা নামার তেমন কেউ নেই। ঘণ্টা দুয়েক চলার পর গতি রুদ্ধ হতে শুরু করল। সামনে অনেক গাড়ির ভিড়। দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হেলতে দুলতে এগোচ্ছে। চারিদিকে ভোরের আলো ছড়িয়ে পড়েছে। প্রাইভেট গাড়ির জন্যই মূলত এই জ্যাম। কতক্ষণ দাঁড়াতে হবে কে জানে।
বাস যেখানে আমাদের নামিয়ে দিল সেটা মূল জায়গা থেকে প্রায় দশ-বারো কিলোমিটার দূর। জায়গাটার নাম সরস্বতী মার্গ। জ্যামের জন্যই বাস আর এগোল না। এই পর্যন্ত আসতেই বাসে মোটামুটি ঘণ্টা চারেক লাগল। কিন্তু এবার? সবাই দেখছি হাঁটছে। রাস্তায় সার দিয়ে গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে স্থবির হয়ে।
কিছুক্ষণ এদিক সেদিন করার পর দেখলাম বাইক নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন অনেকে। তাঁরা বাইকে করে নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেবে। জন প্রতি দেড়শ টাকা। একটা বাইকে দুজন করে চেপে বসলাম। চললাম এলাহাবাদের দিকে। ফুটপাথ দিয়ে অত্যন্ত বিপদজনক ভাবে ঝড়ের গতিতে বাইক চালিয়ে নিয়ে গেলেন বাইক দাদা। প্রায় আধঘণ্টা চলার পর পৌঁছলাম মূল জায়গায়— এলাহাবাদ, অধুনা প্রয়াগরাজ। এবার ভরসা এগারো নম্বর গাড়ি। চারিদিকে লোকে লোকারণ্য। মেলার মাঠে গিজগিজে ভিড়। আমরাও মিশে গেলাম ভিড়ের মধ্যে। কিন্তু যাব কোনদিকে? একটু ভেবেচিন্তে না এগোলে মুশকিল। কোন দিক থেকে কোনদিকে চলে যাব কেউ বুঝতে পারব না।
আমাদের মধ্যে অনির্বাণ পুরো তৈরি হয়েই এসেছিল। সেই আমাদের গাইড। আমরা চললাম তার পিছু পিছু তার পোষা গরুর মতো। ভিড়ের মধ্যে অনির্বাণ যেদিকে যাচ্ছে আমরা সেদিকে। চারিদিকে লোক আর লোক।
কত মানুষ যে দেখছি। দেশের নানান প্রান্ত থেকে নানান ধরণের মানুষ এসেছে। মহিলারা এসেছেন একটা বিরাট সংখ্যায়। দল বেঁধে যারা এসেছেন তাঁরা একে অপরের আঁচলের কোনা ধরে এগচ্ছেন যাতে হারিয়ে না যান। বাচ্চাদের সামলে রাখছে তাঁদের মায়েরা। অনেক সময় দেখছি একটা বৃহৎ দল পরপর দড়ি ধরে হাঁটছে, যাতে কেউ হারিয়ে না যায়। কাগজে কত পড়েছি কুম্ভমেলায় এসে হারিয়ে যায় কত মানুষ, আবার কত মানুষ ফিরে পায় বহুবছর আগে হারিয়ে যাওয়া তার প্রিয়জনদের। এক অদ্ভুত মেলা এই কুম্ভমেলা। বিশ্বাসী অবিশ্বাসী সবার জন্যই যেন কিছু না কিছু আছে এখানে। তাই তো আমিও ভিড়ে গেছি বিশ্বাসী মানুষদের সাথে। দেখা যাক, পায়ে পায়ে কতদূর যেতে পারি।
খাবার দাবারের অভাব নেই। তবে অত্যাধিক দাম দিয়ে কিনতে হবে। আমরা চলেছি সঙ্গমের দিকে। পুণ্যের লোভে। হাঁটছি তো হাঁটছি। যা বুঝলাম, ওখানে কেউই কিছু জানে না। যারা সুরক্ষার দায়িত্বে আছেন, তাঁরা ভিড় কমানোর জন্য প্রতি মুহূর্তে জনতাকে ঘুরিয়ে দিচ্ছেন অন্য দিকে। লক্ষ লক্ষ মানুষের ভিড় সামলানো কঠিন ব্যাপার। তবুও সাহায্য পেলাম কয়েকজনের কাছ থেকে। আর অনির্বাণ তো ছিলই। ওই আমাদের রক্ষা কবচ। প্রায় ঘণ্টা খানেক ঘোরাঘুরি করে অবশেষে পৌঁছলাম ত্রিবেণী সঙ্গমের কাছে। লোকে লোকারণ্য। মহাকুম্ভের জলে অবগাহন করে পুণ্য লাভের উদ্দেশ্যে ছুটে এসেছেন সকলে। অনির্বাণ সৌভিক আর রাজীব স্নান করবে। আমার পুণ্যের লোভ নেই, পাপের ভয় নেই। কোনওরকম ঐশ্বরিক চেতনায় আমার বিশ্বাস নেই। বিশ্বাসী মানুষের প্রতি বিদ্বেষও নেই বিন্দুমাত্র। আমার সাথী তিনজন জামাকাপড় পাল্টে স্নানের উপযোগী পোশাক পরছিল এক জায়গায় দাঁড়িয়ে। আমি ততক্ষণে ভিড় ঠেলে এগিয়ে গেলাম সঙ্গমের দিকে। একটু পরে আবার ফিরে এসে ব্যাগ পাহারা দেব, তখন ওরা যাবে স্নান করতে।
মানুষের গা ঘেঁষে এগিয়ে চলেছি আমি। একদম তীরে গিয়ে দেখলাম স্নান করছে কাতারে কাতারে লোক। তবে সুরক্ষার দিকটাও লক্ষ্য রাখা হয়েছে। নদীতে বেশিদুরে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ঘিরে দেওয়া আছে যাতে কেউ নদীর গভীরে যেতে না পারে ভুল করেও। আর তাছাড়া সরকারি সুরক্ষা বাহিনী তো আছেই। তাঁরা ভিড় সামাল দিচ্ছেন। এক জায়গায় বেশিক্ষণ থাকতে দিচ্ছেন না, ভিড় জমাট বাঁধতে না দেওয়ার চেষ্টা করছেন তাঁরা।
আমি তো স্নানের লোক নই। তবুও প্যান্টটা হাঁটু অব্দি গুটিয়ে জলে নামলাম। ঠাণ্ডা জল। একটা জিনিস খেয়াল করলাম, চারিদিকে যারাই স্নান করছে, প্রায় সবার হাতেই ক্যামেরা বা মোবাইল। ছবি উঠছে, ভিডিও করা হচ্ছে, রিল হয়ে ছড়িয়ে পড়ছে সমাজ মাধ্যমে। ভেবে দেখলাম, কুম্ভ আসলে একটা ‘ইভেন্ট’। মানুষের ধর্মীয় অনুভূতি ছাপিয়ে গিয়েছে এই ইভেন্টে যোগ দেওয়ার আকাঙ্খা। যেন তেন প্রকারেণ একটা ছবি বা ভিডিও বানিয়ে সবাইকে না দেখালে যেন অপূর্ণ থেকে যাবে জীবনের একটা ইচ্ছা।
কিন্তু আমি তো রিল বানাতে আসিনি। এসেছি মানুষ দেখতে। হাঁটু জলে দাঁড়িয়েই আমি সেই মানুষ দেখতে থাকলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ দাঁড়ালে চলবে না। ওরা আবার আসবে। আমি হব ব্যাগ জামাকাপড়ের পাহারাদার।
ধীরে ধীরে উঠে পড়লাম জল থেকে। ভিড় ঠেলে আবার এলাম সাথী বন্ধুদের কাছে। ওরা আমার জন্যই অপেক্ষা করছিল। এবার ওদের যাওয়ার পালা। ব্যাগ জামাকাপড় খুলে স্নানের পোশাকে ওরা এগিয়ে গেল সঙ্গমের দিকে। আমি দাঁড়িয়ে রইলাম একা। চারিদিকে মানুষ আর মানুষ। স্নানের জন্য ছুটছে সবাই। একটা ডুব—শুধু একটা মাত্র ডুব তাঁদের কাম্য। বাচ্চা থেকে বুড়ো নারী থেকে পুরুষ সবারই অবিন্যস্ত পোশাক। পুরুষদের তো একেবারে আদুড় গা। স্নান করে আলুথালু বেশে ডাঙায় উঠে সবার মাঝেই পরিচিত মানুষদের আবডালে কোনও ক্রমে ভেজা পোশাক ছেড়ে শুকনো পোশাক পরে নিচ্ছেন। চারিদিকে একই দৃশ্য। আলাদা করে আমারও কিছু মনে হচ্ছে না। এটাই যেন স্বাভাবিক। কেমন যেন উদাস উদাস লাগছে নিজেকে। মাথার ওপর খোলা আকাশ আর নীচে লক্ষ লক্ষ মানুষের এই বিপুল জন সমাগম। তার মাঝে দাঁড়িয়ে আছি আমি। কত ক্ষুদ্র যে মনে হচ্ছিল নিজেকে তখন! ক্ষুদ্রই তো। বৃহৎ হতে চাইনি তো কখনও আমি।
দাঁড়িয়ে থাকতে থাকতে কত আগডুম বাগডুম কথা মনে আসছিল। গীতায় শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলেছেন,
“ন জায়তে ম্রিয়তে বা কদাচিন্নায়ং ভূত্বা ভবিতা বা ন ভুয়ঃ।
অজো নিত্যঃ শাশ্বতোহয়ং পুরাণো ন হন্যতে হন্যমানে শরীরে।।”
অর্থাৎ, আত্মার জন্ম নেই, মৃত্যু নেই। শরীরের মৃত্যু হলেও আত্মা অপরিবর্তনীয়। কোনও অবস্থাতেই তার কোনও বিনাশ নেই। তা সত্ত্বেও এই বিপুল সংখ্যক মানুষ এসেছেন পুণ্য লাভের আকাঙ্খায়। কিন্তু আত্মারই যখন পরিবর্তন নেই, তখন পাপ-পুণ্যের পেছনে ছুটে লাভই বা কী!
কি জানি, আমি অবিশ্বাসী মানুষ। তাই হয়তো ধর্মের সার কথা বুঝতে অসুবিধা হয়েছে। কিন্তু অমৃতকুম্ভ নিয়ে বিভিন্ন সব কাহিনীগুলো কিন্তু বেশ লাগে শুনতে। লোকমুখে যুগ যুগ ধরে ছড়িয়ে পড়া পুরাণের কাহিনী। একা একা দাঁড়িয়ে মানুষ জনস্রোত দেখতে দেখতে সেই সব ভাবতে থাকলাম।
শ্রীমদ্ভাগবত, বিষ্ণুপুরাণ, মহাভারত, স্কন্দপুরাণ ইত্যাদি শাস্ত্রে এই অমৃতকুম্ভের নানা উপাখ্যান বর্ণিত আছে। আমার জানা তার মধ্যে একটা কাহিনী বলি।
মহামুনি কাশ্যপের দুই স্ত্রী— দিতি আর অদিতি। অদিতির গর্ভে জন্ম নিয়েছিল শুভ শক্তি সম্বলিত বিশ্বের সকল দেবতা আর মুনি-ঋষিরা। অন্যদিকে দিতির গর্ভে থেকে জন্ম নেয় দৈত্যকুলের সবার। অর্থাৎ দেবতা আর দানবরা একই পিতার ঔরসজাত, কিন্তু আলাদা মায়ের গর্ভে। ভাই হলেও দেব আর দৈত্যদের মধ্যে মোটেও সদ্ভাব ছিল না। দৈত্যদের ছিল দানবিক চেহারা, কিন্তু বুদ্ধিতে খাটো। আর দেবতারা শারীরিক ভাবে দৈত্যকুলের মতো শক্তিশালী না, তারা ছিল ক্ষুরধার বুদ্ধির অধিকারী। দেব আর দানবদের মধ্যে প্রায়ই যুদ্ধ লেগে থাকত। সেই যুদ্ধে প্রায়শই দেবতাদের নাকানি চোবানি খেতে হতো দৈত্যদের কাছে। ওদিকে দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের সহায়তায় যুদ্ধে মৃত দানবরা আবার কীভাবে যেন প্রাণ ফিরে পেত। সব মিলিয়ে দেবতারা সকলেই খুব চিন্তিত ছিল কীভাবে নিজেদের শক্তিশালী করা যায়।
দেবতারা সবাই এই বিষয়ে পরামর্শ নিতে গেল ব্রহ্মার কাছে। ব্রহ্মা বললেন, উপায় আছে। সেই উপায় হল অমৃত পান। সেই অমৃত পান করলে অমরত্ব পাওয়া যাবে। কিন্তু সেই অমৃত আছে সমুদ্রের গর্ভে। ক্ষীরসাগর মন্থন করে তুলে আনতে হবে। কিন্তু সে বড় সহজ কাজ নয়। দেবতাদের একার দ্বারা সম্ভব নয় কোনোভাবেই।
ব্রহ্মা নিজেই তখন একটা পরামর্শ দিলেন। তিনি দেবতাদের উপদেশ দিলেন দৈত্যদের সাথে সন্ধি করতে এবং অমৃতের লোভ দেখাতে। সাগর মন্থন করে যে অমৃত পাওয়া যাবে, তা দেব আর দৈত্যদের মধ্যে সমান দুই ভাগে ভাগ হবে।
দেবতাদের এই সন্ধি প্রস্তাব দৈত্যরা সহজেই মেনে নিল। এরপর শুরু হল সমুদ্র মন্থনের তোড়জোড়। মন্দার পর্বতকে করা হল মন্থনদণ্ড আর শেষনাগকে করা হল মন্থনদণ্ডের দড়ি বা বেষ্টনী। সেই নাগের লেজের দিকটা ধরল দেবতারা আর মুখের দিকটা ধরল দৈত্যরা। ভগবান বিষ্ণু স্বয়ং কূর্মরূপ ধরে নিজের পিঠে মন্থনদণ্ড রূপ মন্দার পর্বতকে ধারণ করলেন।
এভাবে সমুদ্রমন্থনের শুভারম্ভ হল। তারপর একশ বছর ধরে চলল এই মন্থন। অনেক কষ্টের শেষে প্রতীক্ষার অবসান ঘটল। অমৃতপূর্ণ কলস হাতে নিয়ে গহীন সমুদ্র থেকে আবির্ভূত হলেন আয়ুর্বেদাচার্য ধন্বন্তরি। এবং সেই সাথে উঠল তীব্র গরল। দেবাদিদেব মহাদেব সমগ্র জগত সংসারকে বাঁচাতে এক চুমুকে পান করলেন সেই হলাহল। বিষের তীব্রতায় তিনি হলেন নীলকণ্ঠ।
অমৃত তো পাওয়া গেল। কিন্তু দৈত্যদের হাতে তো দেওয়া যাবে না এই অমৃত। নয়তো দৈত্যকুলও অমরত্ব পেয়ে যাবে। তাই অসুরদের হাত থেকে অমৃত রক্ষার জন্য ইন্দ্রের পুত্র জয়ন্ত সেই অমৃত কলস নিয়ে পালাল। কিন্তু দৈত্যগুরু শুক্রাচার্যের প্রখর দৃষ্টির হাত থেকে জয়ন্ত নিজেকে আড়াল করতে পারল না। শুক্রাচার্য তখন দৈত্যদের বললেন জয়ন্তের পিছু ধাওয়া করে অমৃতভাণ্ড উদ্ধার করতে।
আর এদিকে দৈত্যরা বুঝতে পারছিল যে দেবতারা তাদের ঠকিয়েছে। তাই এর পরেই শুরু হল দেব-দানবের ভয়ংকর যুদ্ধ। বারো দিন ধরে চলেছিল এই যুদ্ধ। দেবতাদের বারো দিন মানে আমাদের বারো বছর।
ইন্দ্রপুত্র জয়ন্ত এই যুদ্ধ চলাকালীন অমৃতকলস নিয়ে অসুরদের থেকে পালিয়ে বেড়াচ্ছিল। কিন্তু অন্য দেবতারাও এই অমৃত রক্ষার ব্যাপারে সাবধানী ছিলেন। জয়ন্তের অমৃত কলস নিয়ে ঘোরার সময়? চারজনের ওপর দায়িত্ব পড়েছিল জয়ন্তের ওপর নজর রাখার জন্য— চন্দ্র, সূর্য, বৃহস্পতি এবং শনি। জয়ন্তের হাত থেকে অমৃত যাতে গড়িয়ে না পড়ে তার জন্য চাঁদ, কলসি ভেঙে যাতে অমৃত না বেরিয়ে আসে তার জন্য সূর্য, দানবকুল যাতে কোনও ভাবেই এই অমৃতের স্পর্শ না পায় তার জন্য বৃহস্পতি, আর জয়ন্ত নিজেই যাতে এই অমৃত আত্মসাৎ না করে তা দেখার ভার ছিল শনির ওপর।
জয়ন্ত তার এই পলায়ন পর্বের সময় বিশ্রাম নেওয়ার জন্য মর্তের মোট চার জায়গায় এই অমৃতকলসটি রেখেছিল। আরও আট জায়গা ছিল, কিন্তু সেগুলো এই মর্ত্যলোকের বাইরে। এই চারটি জায়গা হল— প্রয়াগ, হরিদ্বার, উজ্জয়িনী এবং নাসিক। স্কন্দপুরাণ মতে,
“গঙ্গাদ্বারে হরিদ্বারে প্রয়াগে চ ত্রিবেণীসঙ্গমে।
ধারায়াং শিপ্রা নদীতটে গোদাবর্যাস্তটে নাসিকে তথা।।”
এরপর ভগবান শ্রীবিষ্ণু দেবতাদের পক্ষ নিয়ে এক সুন্দরীর বেশ ধরে অসুরদের মায়াজালে আবদ্ধ করলেন। যে দৈত্যরা এতদিন অমৃতের জন্য প্রাণপণ লড়াই করছিল তারাই অমৃত ফেলে সেই মায়াবী সুন্দরীকে দেখে মতিভ্রমে পড়ল। আর এই ফাঁকে দেবতারা সেই অমৃত পান করে অমর হল।
‘কুম্ভ’ কথার আক্ষরিক অর্থ হল কলস বা কলসির মতো পাত্র। কিন্তু বিশ্বাসী মানুষদের কাছে এর একটা আলাদা আধ্যাত্মিক তাৎপর্য আছে। তাদের মতে, কুম্ভ হল এমন এক আধার যার মধ্যে অবস্থান করছেন সমস্ত দেব-দেবী। সেই আধারের খোলা অংশটি বিষ্ণুময়, গলার সরু অংশটি রুদ্রময় এবং সেই কুম্ভের গা হল ব্রহ্মস্বরূপ— তা সে মাটির হোক বা যে কোনও ধাতুরই হোক। এটিই বিশ্বাসী মানুষদের কাছে কুম্ভের বিশেষ মাহাত্ম্য।
ইন্দ্রপুত্র জয়ন্ত পৃথিবীর যে চারটি জায়গায় অমৃতপূর্ণ কুম্ভ রেখেছিলেন, সেই চারটি স্থানেই কুম্ভ মেলা হয়ে থাকে। কিন্তু কুম্ভমেলার আবার তিনরকম ভাগ আছে— অর্ধকুম্ভ, পূর্ণকুম্ভ ও মহাকুম্ভ।
প্রতি বারো বছর অন্তর একবার করে পূর্ণকুম্ভ হয় পৃথক পৃথক স্থানে। মনে করা হয় অমৃতভাণ্ড পৃথিবীর চার জায়গায় রাখলেও, শুধু হরিদ্বার এবং প্রয়াগে সেই অমৃতরস পড়েছিল। নাসিক এবং উজ্জয়িনীতে কোনও অমৃতরস পড়েনি। তাই হরিদ্বার ও প্রয়াগে তিন বছর অন্তর অর্ধকুম্ভমেলা অনুষ্ঠিত হয়। আর নাসিক ও উজ্জয়িনীতে অর্ধকুম্ভ না হয়ে শুধু পূর্ণকুম্ভ অনুষ্ঠিত হয়। বারোটি পূর্ণকুম্ভ নিয়ে হয় একটা মহাকুম্ভ। অঙ্কের হিসাবে ১৪৪ বছর পরপর হয় একটা করে মহাকুম্ভ। ঠিক যেমন প্রয়াগের এবারের কুম্ভমেলা ছিল মহাকুম্ভ।
আমি সেই মহাকুম্ভে বিরাট জনসমুদ্রের মাঝে আমার সমস্ত ক্ষুদ্রতা নিয়ে একা দাঁড়িয়ে আছি।
হঠাৎ বন্ধুদের ডাকে সম্বিত ফিরল। স্নান সেরে ফিরে এসেছে তারা। এরপর ভেজা পোশাক বদলে আমরা ভিড় ঠেলে আবার উল্টোমুখে চললাম।
ত্রিবেণী সঙ্গম প্রাঙ্গণে অনেক মন্দির। মন্দিরগুলোতেও খুব ভিড়। একপাশে একটা কেল্লা। আকবরের তৈরি এলাহাবাদ ফোর্ট। ভেতরে ঢোকার জন্য লাইনে দাঁড়ালাম। সে বিশাল লাইন। অনেক ঘুরে ঘুরে অবশেষে ভেতরে ঢুকলাম। একপাশে রয়েছে অক্ষয় বট। যদিও সেখানে যাওয়ার অনুমতি নেই সাধারণ মানুষের। জায়গাটা ঘিরে রাখা আছে।
সমুদ্র মন্থনের সময় সমুদ্র থেকে অমৃত এবং গরলের পাশাপাশি আরও অনেক ঐশী সম্পদ পাওয়া গেছিল। তার মধ্যে একটা হল এই ইচ্ছাপূরণকারী গাছ, যা অক্ষয় বট নামে পরিচিত। প্রাচীন বিশ্বাস অনুযায়ী, এই অক্ষয় বটের বিনাশ নেই, এবং এটি হল সকল প্রকার সাফল্যদায়ী আধ্যাত্মিক শক্তিকেন্দ্র। একে প্রয়াগের রক্ষাকারী দেবতা হিসাবেও দেখা হয়। বিশ্বাসী মানুষদের মতে, এই অক্ষয় বটের মূল দেশে অধিষ্ঠান করেন স্বয়ং ব্রহ্মা। মনে করা হয়, লঙ্কা জয় করে রামচন্দ্র লক্ষণ এবং সীতাকে নিয়ে অযোধ্যায় ফেরার পথে পুজো করেছিলেন এই অক্ষয় বটকে।
এরপর আমরা ঢুকে পড়লাম দুর্গের মধ্যে। ১৫৮৩ খ্রিষ্টাব্দে মুঘল সম্রাট আকবর যমুনা নদীর তীরে এই দুর্গটি তৈরি করেছিলেন। এলাহাবাদ নামটিও তাঁরই দেওয়া— যার অর্থ ঈশ্বরের বাসস্থান। আমরা ঘুরতে ঘুরতে এগোতে থাকলাম। দুর্গটির সব জায়গায় এখন জনসাধারণের জন্য উন্মুক্ত নয়, সম্ভবত মিলিটারি বেস ক্যাম্প হিসাবে ব্যবহৃত হয় এই দুর্গটি। ভেতরে আছে অনেকগুলো মন্দির। সেগুলোর মধ্যে একটি হল পাতালপুরী মন্দির। জনসমাগম সেগুলোকে কেন্দ্র করেই। মন্দিরটির নাম শুনেই বোঝা যায় যে এটি সমুদ্রসমতল থেকে নিচে অবস্থিত। মনে করা হয় যে, অক্ষয়বট এবং এই মন্দির দর্শন ব্যতীত সঙ্গম স্নান পূর্ণ হয় না। ভেতরে বেশ অনেকক্ষণ কাটিয়ে আমরা অন্য দিক থেকে আবার বেরিয়ে পড়লাম।
খিদে পেয়েছে। কিছু মুখে না দিলে আর চলছে না। সারাদিন দানাপানি কিছু পড়েনি মুখে। ঘুরতে লাগলাম খাবারের সন্ধানে। আছে অনেক কিছুই, কিন্তু এই মুহূর্তে সেগুলো খেতে ইচ্ছা করল না। অবশেষে এক ফলওয়ালার কাছ থেকে নিলাম পাকা কলা। তাই খেলাম দুটো করে।
এরপর যাব হনুমান মন্দির দেখতে। আমার যাওয়ার খুব একটা ইচ্ছা ছিল না। কোথাও একটা বসের থাকতে ইচ্ছা করছিল। রাজীবেরও একই মনোভাব। সুতরাং, আমরা থাকলাম বাইরে, অনির্বাণ আর সৌভিক এগোল হনুমানজির দর্শনে। তাঁর দর্শনের আগেই আমাদের দুটো করে কলা খাওয়ার জন্য কিনা জানি না, পবনপুত্র বোধকরি সেই দিন আমাদের ওপর বিরূপ ছিলেন, তাই ফিরে আসতে হল সৌভিক আর অনির্বাণকে। মন্দিরে ঢোকার সময় পেরিয়ে গেছে। মনে মনে বললাম, অপরাধ নিয়ো না হনুমানজি, ক্ষমা করে দিয়ো এই অর্বাচীন বঙ্গীয় ছোকরাদের।
মোটামুটি সব দেখা যখন শেষ হল তখন বেলা দুপুর। পেটে কিছু পড়েনি। আগের সারাটা রাত প্রায় নির্ঘুম। ক্লান্ত লাগছিল খুব। আমাদের ওই দিনটা ওখানেই এলাহাবাদেই কাটানোর কথা ছিল, কিন্তু আমরা ঠিক করলাম সেখানে আর থাকব না। আমরা বারানসীতে ফিরে যাব। আসার সময় বাস থেকে যেখানে নেমেছিলাম, মানে সরস্বতী মার্গে, সেখানেই যাব বলে ঠিক করলাম। কারণ সকালে বাসের কন্ডাক্টর ভদ্রলোকের কাছে শুনে নিয়ে নিয়েছিলাম যে ওখান থেকেও বাস পাওয়া যাবে। তাই আমরা আবার সেই স্থানীয় বাইকম্যানদের বাইকে চড়ে চললাম সরস্বতী মার্গের উদ্দেশ্যে। প্রায় আধঘণ্টার রাস্তা। বাইক যেন পক্ষীরাজের মতো প্রায় উড়ে চলল। কিন্তু সরস্বতী মার্গে এসে দেখলাম, কোথায় কী! সব ভোঁ ভোঁ! আসার সময় যেমন ভিড় ছিল, বাস আসা যাওয়া করছিল সব ফাঁকা। জিজ্ঞাসা করে জানলাম এখান থেকে বাস ছাড়বে না এখন। এলাহাবাদ থেকে যে বাসগুলো আসছে বারানসী যাওয়ার জন্য, সেই চলতি বাসে উঠতে হবে। পাশেই একটা চায়ের দোকান। পেটে ছুঁচোগুলো ডন দিতে দিতে যেন ক্লান্ত হয়ে পড়েছে। ক্ষিদের অনুভূতিও আর নেই। তবুও সেই চায়ের দোকানে ঢুকলাম। শুধু শুকনো খাবার পাওয়া যায় সেখানে। চা বিস্কুট খেলাম। তারপর রাস্তার ধারে এসে দাঁড়ালাম। বাস যদি পাওয়া যায়।
কিন্তু অপেক্ষাই সার। বাস আসছিল মাঝে মাঝে ঠিকই। কিন্তু সবই ভর্তি। তাই আমাদের দেখে বাস দাঁড়াচ্ছিলই না। তারপর একপ্রকার নিরুপায় হয়েই একটা ছোট মারুতি ডিজায়ার গাড়ি ভাড়া করলাম। তারপর চললাম বারানসীর দিকে। তখন বিকেল তিনটে সাড়ে তিনটে হবে। আমরা ফাঁকা রাস্তা ধরে চলছি আর ভাবছি কেমন গেল দিনটা। তখন মনে হচ্ছে, সত্যিই, ভেবে, পরিকল্পনা করে কিছু হয় না। আমাদেরও তো কত পরিকল্পনা ছিল। কিন্তু আমাদের তার কোনওটাই সেদিন কাজে লাগল না। আমরা যেন ঢেউয়ের মতো ভেসে চললাম। ফাঁকা রাস্তা, দুই ধারে ফাঁকা মাঠ। তার মধ্যে দিয়ে আমরা চলেছি। চলেছি তো চলেছি। সন্ধ্যা নেমে এল। তবু রাস্তা যেন ফুরোয় না আর।
বারানসীতে যখন গাড়ি আমাদের নামিয়ে দিল, তখন ছটা বেজে গেছে। যদিও আলোকময় বারানসীতে অন্ধকারের লেশমাত্র নেই। সেখান থেকে আবার অটো ধরলাম। চললাম মূল শহরের দিকে। যেতে যেতেই ঠিক করলাম ভারত সেবাশ্রমে একবার ঢু মারব মাথা গোঁজার ঠাই যদি মেলে। প্রায় আধঘণ্টা পরে অটো আমাদের নামিয়ে দিল ভারত সেবাশ্রমের সামনে। সবাই মিলে গিয়ে ঢুকলাম সেখানে। কিন্তু কোনও জায়গা নেই। বেরিয়ে এলাম আবার। সাতটা বাজতে যায়, কিন্তু তখনও জানি না কোথাও থাকব। সবাই খোঁজ করছি এদিক ওদিক। যদি একটা হোটেল পাওয়া যায়। কিন্তু কোথায় হোটেল। আসলে আমরা গঙ্গা থেকে বেশ খানিকটা দূরে ছিলাম। বেশীরভাগ হোটেল বা থাকার জায়গা গঙ্গাতীরবর্তী মন্দিরগুলোর আশেপাশেই। তাই আমাদের হোটেল খুঁজে পেতে বেশ কসরত করতে হচ্ছিল।
তবে পেলাম অবশেষে। ভাল ঘর এবং বেশ সস্তায়। চারজনের দু’রাত দু’দিনের জন্য ভাড়া দু’হাজার টাকা। সৌজন্যে অবশ্যই অনির্বাণ। তারপর আর কী, খেয়েদেয়ে ক্লান্ত অবসন্ন শরীর এলিয়ে দিলাম বিছানায়। শুয়ে শুয়ে মনে হল, একটা রাত যদি কুম্ভতে কাটাতে পারতাম, তাহলে পরদিন ভোরে কুম্ভের এক অন্য রূপ হয়তো প্রত্যক্ষ করতে পারতাম। তারপর ঘুমের তোড়ে এই সব ভাবনা অচিরেই ভেসে গেল কোন সুদূরে… (ক্রমশঃ)
