Mr.Khajuraho - Curated Global Insights. Stories That Matter.
Return to Archives
✦ ARCHIVE DISPATCH № KH-9D9CREADING TIME: 9 MIN
#Cultural#Socio-Cultural

নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (পর্ব-২)

Jul 28, 2026Chronicled by একলব্য 286 Reader Explorations
নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (পর্ব-২)
ARCHIVAL FIELD PLATE I — নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (পর্ব-২)AUTHENTICATED RECORD
REFERENCE WIRE: প্রথম পর্বের লিঙ্কhttps://www.mrkhajuraho.com/post/6a69b92a8b11579fdc979d9a
Inspect Link ↗

রদিন বেরোতে বেরোতে আটটা বাজল। আজ যাব ঘাটের দিকটায়। ওদিকে অনেকগুলো মন্দির আছে। কাশী বিশ্বনাথ মন্দির ছাড়াও কালভৈরব মন্দির খুব বিখ্যাত। আমরা হোটেল থেকে বেরিয়ে কিছুটা হেঁটে তারপর অটো ধরলাম। আমাদের নিয়ে অটোর চাকা গড়াল। বারানসীতে লোকজনের সংখ্যা নেহাত কম নয়। সকাল থেকেই রাস্তাঘাটে বেশ ভিড়। সেই ভিড় কাটিয়ে অটো আমাদের প্রায় মিনিট কুড়ি পরে যে জায়গায় নামিয়ে দিল সেখান থেকে বাকি পথটা হেঁটেই যেতে হবে।

আমরাও হাঁটা শুরু করলাম। প্রথমে পড়বে কালভৈরব মন্দির। রাস্তায় দিকনির্দেশ করা আছে। আমরা সেদিকেই এগোলাম। অনেকেই হাঁটছে। কোথাও এসে না হাঁটলে অনেক কিছু অসম্পূর্ণ থেকে যায়। মিনিট দশেক হাঁটার পর কালভৈরব মন্দিরের লাইন দেখতে পেলাম। দাঁড়িয়ে পড়লাম লাইনে। পুজো দেওয়ার ইচ্ছা আমার যদিও ছিল না। তবুও দাঁড়ালাম লাইনে। মন্দিরটা কেমন সেটা তো দেখতে পাব।

লাইন যেন এগোচ্ছেই না। একজন বলল, অন্তত দু’ঘণ্টা লাগবে। সকালে কিছু খাইনি। মন্দির বেরোতে বেলা বারোটা বেজে যাবে। ঠিক হল আগেই যদি খেয়ে নেওয়া যায় কিছু। কিন্তু লাইনে তো দাঁড়িয়ে আছি। লাইন থেকে বেরোলে আবার সবার পেছনে পড়ে যাব। ঠিক হল, দুজন লাইনে দাঁড়াবে, আর দুজন খেয়ে আসবে। তারা খেয়ে এলে বাকি দুজন যাবে। প্রথমে আমি আর রাজীব বেরোলাম লাইন ছেড়ে। কাছেই একটা দোকান ছিল। ঢুকে পড়লাম।

খেয়ে দেয়ে কিছুক্ষণ পরে যখন বেরোলাম, তখন অনির্বাণ আর সৌভিক লাইনে অনেকটা এগিয়ে গেছে। ওদের সাথে যোগাযোগ করে আমরাও এগোলাম। কিন্তু পথে বাঁধ সাধল পুলিশ। লাইনে দাঁড়ানো লোকজনের অভিযোগ ছিল বাইরে থেকে এসে অনেকে ঢুকে যাচ্ছে লাইনে। আমরাও পড়ে গেলাম সেই বহিরাগতদের দলে। বোঝানোর চেষ্টা করলাম তাদের যে আমরা লাইনেই ছিলাম। কিন্তু জনগণ একবার ক্ষেপে গেলে আর কে কার কথা শোনে। অতএব কপালে জুটল পুলিশের অর্ধচন্দ্র। হে কালভৈরব! সবই তোমার লীলা!

এক যাত্রায় পৃথক ফল! আমরা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলাম। মন্দিরে না ঢুকতে পারার জন্য আমার বিশেষ খারাপ লাগছিল না বটে, কিন্তু এবার আমরা কী করব সেটাই ভাবছিলাম। যাই হোক, আমরা মন্দির চত্বর থেকে বেরিয়ে এলাম। কাছেই গঙ্গার ঘাট। ঠিক করলাম কোনও একটা গঙ্গার ঘাটে গিয়ে বসব। সেদিন আমাদের গঙ্গার ঘাটে যাওয়ার পরিকল্পনা এমনিতেও ছিল, কিন্তু বিকেলে। আমরা একটু আগেই যাই না হয়।

আমরা স্থানীয় মানুষদের জিজ্ঞাসা করে করে এগোতে থাকলাম। কিছুটা যেতেই দেখলাম মালাই বিক্রি হচ্ছে। দুজনে খেলাম। অমৃত কুম্ভের সন্ধান পেয়েছি কিনা জানি না, কিন্তু এ সত্যিই অমৃত। সে স্বাদ যেন মুখে লেগে আছে এখনও।

আবার চলতে শুরু করলাম। একজন বয়স্ক মানুষ একটা সরু গলি দেখিয়ে বললেন ওই গলি ধরে চলে যেতে। ধরলাম সেই গলি। কিন্তু কতদূর যাব, সেই গলি থেকে আরও কত শত শাখাগলি যে বেরিয়েছে, মিশেছে আরও কত উপগলি! গঙ্গার ধার ঘেঁষে কাশীর বিখ্যাত সব অলিগলির কথা শুনেছি, সিনেমায় দেখেছি, বইতে পড়েছি। আজ আমরা চলেছি সেই পথে। এ অভিজ্ঞতাও তো নেহাত কম নয়। চারিদিকে পুরনো সব উঁচু উঁচু বাড়ি। বারানসী খুব পুরনো শহর। সম্ভবত ভারতের প্রাচীনতম এবং বিশ্বেরও অন্যতম প্রাচীন।

অবশেষে বেশ কিছুক্ষণ এমনভাবে ঘোরাঘুরির পরে অবশেষে একটা ঘাটে এসে উঠলাম। ঘাটের নাম পেশোয়া ঘাট। কিন্তু ঘাটে এসেই মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে গেল। প্রচণ্ড ভিড়। পা রাখবার জায়গা নেই কোথাও। আমরা সেই গলির মুখ থেকে সিঁড়ি বেয়ে ভিড় ঠেলে ঘাটে নামলাম। ঘাটে তিলধারণের জায়গা নেই। তার ওপর টানা রোদ। বায়ে গঙ্গাকে রেখে আমরা দক্ষিণ দিকে আরও এগোতে থাকলাম ঘাট বরাবর। সিন্ধিয়া ঘাটেও প্রচণ্ড ভিড়। আমরা চাইছিলাম কোথাও একটা বসতে। একটু যদি ছায়া মতো জায়গা পাওয়া যায়। ফেব্রুয়ারি মাসেই গরমে হাঁসফাঁস করছি। আর সেই কখন থেকে হেঁটেই চলেছি। পরের ঘাটের দিকে তাকিয়ে দেখলাম ধোঁয়া উঠছে। চিতার আগুনের ধোঁয়া। মণিকর্ণিকা ঘাট। আর সেখানে শুধু মাথা গিজগিজ করছে। মণিকর্ণিকা ঘাটে যাওয়ার আগে একটা গাছতলা পাওয়া গেল। ছোট একটা অশ্বত্থ গাছ। কিন্তু তার নীচে বসে আছে অনেকে। আমরা সেখানে দাঁড়ালাম কিছুক্ষণ। তারপর একটা জায়গা পাওয়া গেলে বসলাম। তারপর একটু এদিক ওদিক সরে বসতেই আর একটা জায়গা পাওয়া গেলেও। গঙ্গার দিকে মুখ করে গাছের নীচের বাঁধানো বেদিতে বসলাম। মাঝে মাঝে ফুরফুরে হাওয়া দিচ্ছে। এতক্ষণ হয়তো দিচ্ছিল, টের পাইনি। এখন ঠাণ্ডা গাছতলায় বসে সেই শীতল হাওয়ায় যেন প্রাণ জুড়িয়ে গেল।

কত লোক— কত হাজার হাজার লোক আসছে যাচ্ছে। এক একটা বড় বড় স্টিমারের করে ভর্তি হয়ে আসছে যাচ্ছে। আসার সংখ্যাই বেশি। গঙ্গায় স্নান করছে। এতক্ষণ রোদের মধ্যে, ভিড়ের মধ্যে হাঁটছিলাম বলে ভাল লাগছিল না। এবার এই ঠাণ্ডা জায়গায় বসে সামনের সব দৃশ্য দেখতে বেশ ভাল লাগছে। আশপাশ থেকে নানা রকমের কথা কানে আসছে। বেশিরভাগই বুঝতে পারছি না। ভারতের দক্ষিণভাগ থেকে অনেক মানুষ এসেছেন এখানে। মারাঠি গুজরাটি রাজস্থানির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। তাদের নানা রকম ভাষা, পোশাক, বিবিধ সব সাজগোজ। অনেকে এসেছে দল বেঁধে, তাদের পোশাকের রঙ এক। হলুদ, বেগুনি, লাল ইত্যাদি। সম্ভবত নিজেদের চেনার সুবিধার্থে এই পন্থা অবলম্বন করেছেন। অনেকের মাথায় আবার একই রঙের টুপি। আমি যেন এক অবাক করা জায়গায় এসে পড়েছি।

ঘাটের ওপরের এক দোকানদার দাদার সাথে কথা বলে জানলাম, কুম্ভ বলেই বারানসীতে এতো ভিড়। কুম্ভে স্নান করে সবাই এখানে এক পাক দিয়ে যাচ্ছে। সামনে আবার শিবরাত্রি আছে। তখন কাশীর বিশ্বনাথ দর্শনের জন্য আরও জনসমাগম হবে। তিনি এও বললেন যে, কুম্ভ শেষ হলেই বারানসীর ঘাটে মাছি তাড়ানোর লোক থাকবে না। ফাঁকা, সব ফাঁকা হয়ে যাবে। তাদের ব্যবসাও তখন চলবে ঢিমে তালে।

গঙ্গা দিয়ে জল বয়ে যাচ্ছে। সেই সাথে কেটে যাচ্ছে মুহূর্ত। মানুষ আসছে মানুষ যাচ্ছে। আমরা বসে আছি গঙ্গাতীরবর্তী প্রাচীন এই জনপদে। হিন্দু ধর্মাবলম্বীরা মনে করেন, বারানসী নাকি স্বয়ং মহাদেবের সৃষ্টি। পার্বতীকে বিয়ের পর মহাদেব তাঁকে নিয়ে থাকার জন্য এই স্থানের সৃষ্টি করেন। ধর্মপ্রাণ হিন্দুরা বিশ্বাস করেন যে, এই শহরে দেহত্যাগ করলে জন্মচক্র থেকে মুক্তি পাওয়া যায়। তাকে আর জন্মাতে হয় না। তাই আগের দিনে শেষ বয়সে অনেকেই কাশীবাসী হতেন।

অন্যদিকে ইতিহাস বলে, আজ থেকে প্রায় তিন হাজার বছর আগে বৈদিক যুগে এই শহরের পত্তন হয়। সেই প্রাচীন কাল থেকে শিক্ষা-দীক্ষা থেকে শুরু করে ধর্মীয় পীঠস্থান হয়ে উঠেছিল এই শহর।

ঘণ্টাদুয়েকেরও বেশি সময় সেখানে বসে থাকার পর কালভৈরব মন্দিরে পুজো দিয়ে অনির্বাণ আর সৌভিক এল। তখন বেলা একটা বেজে গেছে। আমরা তাও সকালে কিছু খেয়েছি। ওদের পেটে কিছুই পড়েনি। খেতে হবে। এই ভিড় ঠেলে রোদের মধ্যে আবার খাবার খুঁজতে বেরোতে হবে ভেবেই যেন অস্বস্তি হল। কিন্তু পেট বড় বালাই। আরও কিছুক্ষণ থেকে সেখান থেকে বেরিয়ে পড়লাম।

আবার সেই কাশীর বিখ্যাত গলিপথ। এ গলি সে গলি করতে করতে রাস্তায় এসে উঠলাম। রাস্তার ধার দিয়ে দেখছি অগণন মানুষের লম্বা লাইন। কীসের লাইন জিজ্ঞাসা করাতে জানলাম, বিশ্বনাথ দর্শনের জন্য লাইনে দাঁড়িয়েছেন ভক্তরা। বিশাল সে লাইন। শেষ শুরু কিছু নেই। ভগবানের চেয়ে ভক্ত বড়। ভক্তের মধ্যেই ভগবানের অবস্থান। আমরা সেই ভক্তের ঢল দেখতে দেখতে এগিয়ে যাচ্ছি। আমাদের উদ্দেশ্য পেটপুজো।

ঢুকলাম একটা হোটেলে। কাশীর বেশিরভাগ হোটেলেই নিরামিষ খাবার চলে। আমিষের চল কম, অন্তত আমার তাই মনে হয়েছে। যাই হোক, আমরা চারজনে হাতমুখে জল দিয়ে এসে প্রত্যেকের জন্য নিরামিষ থালির ফরমায়েশ করে একটা টেবিল দখল করে বসলাম। খাবার চলে এল কিছুক্ষণের মধ্যেই। লম্বা সরু চালের ভাত, ডাল, দু’রকম সবজি, পনিরের তরকারি। সম্ভবত আমার খাওয়া অন্যতম সুস্বাদু খাবার সেদিন খেয়েছিলাম সেদিন। ডালের যা স্বাদ ছিল, শুধু সেই ডাল দিয়েই হয়তো এক থালা ভাত আমি অনায়াসে খেয়ে নিতে পারতাম। বারানসীর খাঁটি গব্য ঘিয়ের কথা শুনেছি অনেক। সেই গব্য ঘিয়ের ব্যবহার কি ছিল এই ডালে? কী জানি! তবে খিদের মুখে সেই খাবার যেন মন ভরিয়ে দিয়েছিল সেদিন। সে স্বাদ যেন এখনও আমার মুখে লেগে আছে।

খাওয়া-দাওয়া সেরে যখন বেরোলাম তখন বেলা আড়াইতে-তিনটে বাজে। আসলে আমাদের পরিকল্পনা ছিল যে সকালে পুজো সেরে খেয়েদেয়ে ঘরে চলে আসব। একটু বিশ্রাম নিয়ে তারপর আবার বিকেলে হাঁটতে হাঁটতে গঙ্গার ঘাটের দিকে যাব। নৌকা চড়ব। কিন্তু এখন যদি আবার ঘরে যাই, তারপর বেরোতে বেরোতে দেরি হয়ে যাবে। তাই আমরা ঘাটের দিকেই রওনা দিলাম। যেদিকেই তাকাই, শুধু জনসমুদ্র। এর ঠেলা ওর গোত্তা খেতে খেতে এগোচ্ছি আমরা। কাশী বিশ্বনাথ দর্শনের জন্য সবাই দশ–বারো ঘণ্টা ধরে লাইনে দাঁড়িয়ে আছে। পরেরদিন আমাদেরও বিশ্বনাথ দর্শনের কথা আছে। আমাদের মানে আমি বাদে বাকি তিনজনের। কখন থেকে লাইন দিতে হবে সেটাই একটা চিন্তার ব্যাপার। সেদিন রাতেই আবার আমাদের ফেরার ট্রেন।

ভিড় ঠেলে যখন দশাশ্বমেধ ঘাটে এলাম তখন বিকেল প্রায় চারটে বাজে। ভিড়ের তবুও কমতি নেই। দশাশ্বমেধ আর মণিকর্ণিকা— এই দুটো ঘাটেই ভিড়টা মূলত কেন্দ্রীভূত হয়ে আছে। গঙ্গার বুকে নৌকা বিহার করছেন অনেকে। অনেক নৌকা, স্টিমার ভেসে বেড়াচ্ছে গঙ্গাবক্ষে।

কিছুক্ষণ অপেক্ষার পর আমরাও চেপে বসলাম একটায়। এতক্ষণ ঘাটে বসে গঙ্গার শোভা দেখছিলাম। এখন গঙ্গার বুকে ভেসে ভেসে ঘাটের দৃশ্য দেখতে থাকলাম। অপরূপ অসামান্য সে দৃশ্যপট। পুরনো সব স্থাপত্যের অনির্বচনীয় রূপ দেখে মনে হল টাইম মেশিনে করে প্রাচীন কোনও সভ্যতায় এসে পড়েছি আমি। হাজার হাজার মানুষ তখনও ঘাট বরাবর হেঁটে চলেছে। আমাদের পাশ কাটিয়ে চলেছে আরও অনেক স্টিমার বোট। একের পর এক ঘাটের দৃশ্য আমরা নদীর বুকে বসে বসে দেখতে পাচ্ছি। ঘাট বরাবর তৈরি পাথরের উঁচু উঁচু বাড়িগুলো দেখে সত্যিই বিস্ময় জাগে। না জানি কত ইতিহাস লুকিয়ে আছে প্রতিটা বাড়ির মধ্যে। কত দুঃখ-কষ্ট-বেদনা-আশা-আকাঙ্খার ছাপ আঁকা আছে সেই সব পাথরে।

নৌকায় বসে পাড়ের স্থাপত্যগুলোর দিকে তাকিয়ে বারানসী সম্পর্কে মার্ক টোয়েনের কথাগুলো মনে পড়ে গেল। তিনি লিখেছিলেন, “It is older than history, older than tradition, older even than legend, and looks twich as old as all of them put together”।

বিজ্ঞান মানুষকে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে ঠিকই। কিন্তু ইতিহাসই আসলে মানুষকে অমর করেছে। ইতিহাসের সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে যেন অতি ক্ষুদ্র মনে হয়। ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র।

প্রায় চল্লিশ মিনিট নৌকাবিহারের পর আমরা আবার পাড়ে এসে নামলাম। পাঁচটা বেজে গেছে তখন। দিনের আলো কমে আসার সাথে সাথে ঘাটে লোকজনও কমে এসেছে। তাছাড়া দশাশ্বমেধ ঘাট থেকে দূরের অন্য একটা ঘাটে আমরা নেমেছি। তাই এখানে অপেক্ষাকৃত লোকজন কম। আমরা গিয়ে বসলাম বাঁধানো ঘাটের ধাপে। গঙ্গার দিক থেকে মিঠে বাতাস বইছে। মনের মধ্যে তৃপ্তির আনন্দ। স্টিমারগুলোতে আলো জ্বলে উঠেছে। গঙ্গার বুকে সেই আলো প্রতিফলিত হয়ে ঝিলমিলিয়ে উঠছে। ঘাটগুলোতেও একে একে জ্বলে উঠছে সাদা বৈদ্যুতিক আলো। কথা বলতে ইচ্ছা করছিল না আমার। মনে হচ্ছিল যে, শুধু চুপচাপ বসেই থাকি। সামনে গঙ্গোত্রী থেকে বয়ে আসে প্রবাহমান মা গঙ্গা। বাঁধানো ঘাট থেকে সিঁড়ি বেয়ে নেমে এসে গঙ্গায় পা ডুবিয়ে বসলাম একজায়গায়। বারানসীর গঙ্গায় স্নান করলে নাকি সবার সব পাপ ধুয়ে যায়। যদিও পাপস্খালনের আকাঙ্খা আমার নেই। তবুও শুধু ওই পাদুটো ডোবাতেই সারাদিনের সব ক্লান্তি যেন সব শুষে নিলেন স্নেহশীলা মা গঙ্গা।

কতক্ষণ যে পা ডুবিয়ে বসে ছিলাম জানি না। সম্বিত ফিরল রাজীবের ডাকে। এবার ফিরতে হবে। চারিদিকে তাকিয়ে দেখলাম সন্ধ্যা পেরিয়েছে অনেকক্ষণ। ওখান থেকে উঠতে ইচ্ছা করছিল না একদমই। কিন্তু উঠতে তো হবেই।

আবার অলিগলি পেরিয়ে মূল রাস্তায় এলাম। কিন্তু গাড়ি পাই না আর। রাস্তায় সবাই শুধু হাঁটছে আর হাঁটছে। আমাদেরও ভরসা আমাদের এগারো নম্বর গাড়ি। ফেরার পথে এক জায়গায় দাঁড়িয়ে বারানসীর বিখ্যাত রাবড়ি খেলাম। অসাধারণ সেই স্বাদ।

তারপর আবার চলা শুরু। একেবারে রাতের খাবার খেয়েই ঢুকব ঘরে। সেই কোন সকালে বেরিয়েছি। তারপর আবার এই হাঁটা। প্রায় ঘণ্টাখানেক ধরে হাঁটলাম। মাঝে একজায়গায় শুধু ডালভাত খেলাম। সত্যিই, এখানকার খাবারের কথা বলতে গেলে ডালের কথা সবার আগে আসবে। কী অসাধারণ যে লেগেছিল এই ডাল খেতে। আরও কয়েকবার ডাল চেয়ে নিয়ে শুধু চুমুক দিয়েই খেয়ে নিলাম। ডালের মধ্যে ঘিয়ের ব্যবহার করে খুব বেশি। সেই জন্যই স্বাদটা এতো বেশি মুখে লাগে। শুধু ডালভাত খেতে যে এতো সুন্দর লাগে বারানসী না গেলে আমি জানতে পারতাম না।

যাই হোক, সেদিন হাঁটতে হাঁটতে অবশেষে পৌঁছলাম আমাদের আস্তানায়। অনির্বাণ আর সৌভিক পরদিন রাত থাকতে উঠে লাইন দেবে বিশ্বনাথ দর্শনের জন্য। রাত থাকতে মানে রাত একটা দেড়টা নাগাদ বেরোবে বলছে। আমি কী করব স্থির করতে পারছিলাম না। আজ সারাদিনের ক্লান্তি, তারপরে মাঝ রাতেই যদি আবার বেরোতে হয়! বিশ্বনাথ দর্শনের আকাঙ্খা আমার নেই বটে, তবে রাতের বারানসীর ঘাট দেখার লোভও হচ্ছিল মনে মনে। রাজীবের দেখলাম মাঝরাতে ওঠার ইচ্ছা নেই। অর্থাৎ, গেলে আমাকে একাই ঘাটে বসে থাকতে হবে। কী করব স্থির করতে পারছিলাম না। শুধু ওদের বেরোনোর সময় ডাকতে বললাম আমাকে। যদি ইচ্ছা করে তখন যেতে, তবে যাব। নয়তো যাব না.....(ক্রমশঃ)

অন্তিম পর্বের লিঙ্ক: https://www.mrkhajuraho.com/post/6a6b64a7bce2408e817d0394 ↗

✦ ──── ❦ ──── ✦
DISPATCH WIRE:
Next Expeditions

Continue the Cultural Journey

✉ Correspondence Archive

Curator's Postbox

📬1 Letter on file
PEN YOUR LETTERYour thoughts become part of the permanent record
#01
রেজওয়ানা পারভীন
Jul 28, 2026

ভাইয়া, খুব ভালো লাগসে এই পর্বটাও। কিন্তু শেষ হইলো নাতো! তাড়াতাড়ি পরের পর্ব দ্যান। অপেক্ষায় রইলাম।❤️

EkalavyaJul 28, 2026

@রেজওয়ানা পারভীন ধন্যবাদ আপু। আপনি মন দিয়ে পর্বগুলো পড়ছেন জেনে খুব ভালো লাগলো। এর পরবর্তী পর্ব খুব শীঘ্রই আসবে।

✦ END OF CORRESPONDENCE LEDGER — 1 LETTER ON RECORD ✦
0%
READ
1