মেঘমুলুকের আবছায়াতে (পর্ব-১)
রাত্রে ট্রেনের দুলুনিতে বেশ ঘুমাচ্ছিলাম। ঘুম ভাঙল আমার সহযাত্রী বন্ধুর ডাকে। ট্রেন তখন কামাখ্যা স্টেশনে দাঁড়িয়ে। এর পরেই গুয়াহাটি। আমাদের আপাত গন্তব্য। উঠলাম ধড়ফড় করে। কামাখ্যা থেকে গুয়াহাটি যেতে মিনিট দশ-পনেরোর বেশি লাগার কথা নয়। ঝটপট উঠে পড়লাম। ব্যাগ-ট্যাগগুলো নামিয়ে রেডি হলাম। আশেপাশে চেয়ে বুঝলাম, গুয়াহাটিতে নামার লোক নেহাত কম নয়।
গুয়াহাটিতে যখন নামলাম, তখন ভোর তিনটে পঁয়তাল্লিশ। ভারতীয় রেলের ‘সর্বজনবিদিত সময়জ্ঞানকে’ একপ্রকার বুড়ো আঙুল দেখিয়েই কাজিরাঙ্গা এক্সপ্রেস ট্রেন একদম সঠিক সময়েই গুয়াহাটি স্টেশনে এসে পৌঁছালো। নেমেই সোজা গেলাম ওয়েটিং রুমে। দাঁত মেজে চোখে মুখে জল দিয়ে ঘুমের রেশটা কাটিয়ে নিলাম সবাই। তারপর আমরা তিন মূর্তি কফিতে চুমুক দিতে দিতে ফোন করলাম আমাদের ড্রাইভার সাহেব কাম গাইড ভিকি লস্করকে। ট্র্যাভেল এজেন্সিই ঠিক করে দিয়েছিল ভিকিদাকে। তাঁর তত্ত্বাবধানেই আমাদের এবারের এই সমগ্র ভ্রমণ সম্পন্ন হবে।
ভিকিদাকে প্রথমবার দেখেই বেশ পছন্দ হয়ে গেল। মনখোলা মানুষ। বয়স ত্রিশের আশেপাশেই। ফলে আমাদের সাথে মিশে যেতে তাঁরও সমস্যা হয়নি, আমাদেরও হয়নি। ভিকিদা যখন গাড়ি স্টার্ট দিলেন, তখন ঘড়ির কাঁটা ভোর পাঁচটার ঘর ছুঁই ছুঁই করছে। আমাদের আজকের প্রথম গন্তব্য কামাখ্যা মন্দির।
হিন্দু পুরাণ অনুযায়ী, দক্ষরাজ নিজের বাড়িতে যজ্ঞের অনুষ্ঠানে অন্য সব দেবতাদের আমন্ত্রণ জানালেও নিজের মেয়ে জামাইকে তিনি আমন্ত্রণ জানাননি। কারণ দক্ষরাজ মহাদেবকে পছন্দ করতেন না। তবুও নিজের বাপের বাড়ি অর্থাৎ দক্ষরাজের বাড়িতে আমন্ত্রিত না হয়েও সেখানে উপস্থিত হন দেবী সতী। সেখানে দক্ষরাজ দেবীর সামনেই তাঁর স্বামী মহাদেবকে অপমান করেন। স্বামীর অপমান সইতে না পেরে ক্ষোভে-দুঃখে সেই যজ্ঞের আগুনে ঝাঁপ দিয়েই দেহত্যাগ করেন সতী। শোকাহত মহাদেব তখন সতীর মৃতদেহ কাঁধে নিয়ে বিশ্বব্যাপী প্রলয় নৃত্য শুরু করলে, স্বর্গের অন্যান্য দেবতাদের অনুরোধে ভগবান বিষ্ণু তাঁর সুদর্শন চক্র দিয়ে সতীর মৃতদেহ ছিন্নভিন্ন করে দেন। সতীর এই ছিন্ন দেহখণ্ডসমূহ উপমহাদেশের যে যে জায়গায় পড়েছিল, সেই জায়গাগুলোই পবিত্র শক্তিপীঠ বা সতীপিঠ নামে পরিচিত। ভারতের একান্ন শক্তিপীঠের একটি হল এই কামাখ্যা মন্দির। পুরাণ মতে, এই স্থানে দেবীর গর্ভ এবং যোনি এসে পড়েছিল।
নীলাচল পাহাড়ের ওপরে অবস্থিত কামাখ্যা মন্দির। বিশ্বাসীরা বলেন, দেবীর দেহাংশ এই পাহাড়ে পড়ার পর এই জায়গাটা নাকি নীল হয়ে গিয়েছিল, সেই থেকে পাহাড়ের নাম নীলাচল। সমতল থেকে আটশ মিটার উঁচুতে অবস্থিত মন্দিরটি। কিন্তু চলার সময় গাণিতিক দূরত্ব দেখলে হবে না। কারণ উঠতে হবে পাকদণ্ডী বেয়ে। পাহাড়ের গা বেয়ে কামাখ্যা মন্দিরের দিকে যাওয়ার রাস্তাটা খুব সুন্দর। পাহাড়ের ঢাল বেয়ে মিহি সাদা কুয়াশার ভেতর দিয়ে উপরে উঠছিল আমাদের গাড়ি। মন্দিরে যাওয়ার পথে ডান দিকে পাহাড়ের উঁচু ঢাল আর বা দিকে অনেক নীচে ভোরের ঘুমজড়ানো গুয়াহাটি শহর। যত মন্দিরের দিকে উঠছি, শহর আরও ছোট হয়ে যাচ্ছে। ফাঁকা রাস্তা দিয়ে মিনিট কুড়ির মধ্যেই পৌঁছে গেলাম কামাখ্যা মন্দিরে। পুজো দেওয়ার উদ্দেশ্য আমাদের কারুরই ছিল না। মন্দির দর্শন, বলা ভাল, মন্দিরে আগত বিশ্বাসী মানুষ দর্শনই ছিল আমার মূল লক্ষ্য।
গাড়ির মধ্যেই জুতো খুলে রেখে আমরা খালি পায়ে এগোলাম মন্দিরের দিকে। দুই পাশে পুজোর সামগ্রী, প্রসাদী উপকরণ সারি সারি দোকানপাঠ— ভারতবর্ষের বাকি অন্য সব ধর্মীয়স্থানের মতোই। মন্দিরের ভেতরে সেই ভোর সকালেই লম্বা লাইন। ভিড় করেছেন ভক্তবৃন্দ। আমরা পায়ে হেঁটে ঘুরতে লাগলাম মন্দিরের আনাচকানাচ। মূল মন্দির তখনও খোলেনি। আমরা মন্দির চত্বরটা ঘুরে ফিরে এসে বসলাম মন্দিরের পাশেই উঁচু পাথুরে জায়গায়। তন্ত্রবিদ্যা, দশমহাবিদ্যার অন্যতম পিঠস্থান এই জায়গা। রয়েছে বলিঘর। নিয়মিত বলি হয় এখনও। অনেকেই বসে ছিলেন সেখানে। ধ্যান করছিলেন, ধর্মীয় বই পড়ছিলেন। গেরুয়াবসনধারী একজন সাদা চামড়ার বিদেশীকেও দেখলাম সেখানে বসে ধ্যান করতে। এই তো আমার দেশ। ভিনদেশের মানুষও এখানে মিশে যায় এদেশীয় স্রোতে।
কামাখ্যার মন্দিরটি তিনটি ভাগে বা কক্ষে বিভক্ত। তিনটি মন্দিরও বলা চলে। তৃতীয় বা শেষ গুহাসদৃশ্য কক্ষটিই মূল গর্ভগৃহ। সেখানে সরু অন্ধকারাচ্ছন্ন জায়গায় রয়েছে যোনি আকৃতির একটি পাথর। নীচ থেকে প্রাকৃতিক প্রস্রবণের দ্বারা ওই পাথরটি সর্বদা সিক্ত। প্রকৃতি এবং মানুষের ধর্মবিশ্বাস সেখানে এসে মিলেছে।
সমগ্র নীলাচল পাহাড় জুড়েই শক্তির বিভিন্ন রূপ হিসাবে রয়েছে আরও অনেক মন্দির। দেবী কামাখ্যা ছাড়াও বিভিন্ন মন্দিরে অবস্থান করছেন মহাকালী, তারা, ত্রিপুরেসুন্দরী, ভুবনেশ্বরী বা জগদ্ধাত্রী, শৈলপুত্রী, ব্রহ্মচারিণী, মঙ্গলচণ্ডী, কুষ্মাণ্ডা, মহাগৌরি, চামুণ্ডা, কৌশিকী, দাক্ষায়ণী সতী, চন্দ্রঘণ্টা, স্কন্দমাতা, কালরাত্রি, কাত্যায়নী, সিদ্ধিদাত্রী, শাকম্ভরী, হৈমবতী, শীতলা, সঙ্কটনাশিনী, বনচন্ডী, দেবী দুর্গা, মহা ভৈরবী, ধূমাবতী, ছিন্নমস্তা, বগলামুখী, মাতঙ্গী এবং দেবী কমলা।
ওখানেই পরিচয় হয়েছিল এক ভদ্রলোকের সাথে, যাঁর আদি বাড়ি সোদপুর। যদিও তিনি বহু বছর ধরেই থাকেন এই মন্দির সংলগ্ন অঞ্চলে। তিনি বললেন, ভোর চারটে থেকে লাইন দিলে পুজো দিতে দিতে বিকেল হয়ে যায়। তবে রয়েছে ভিআইপি লাইন। পাঁচশ টাকা দিয়ে সেই লাইনে দাঁড়ালে অপেক্ষাকৃত কম সময়ে পৌঁছে যাওয়া যাবে মন্দিরের গর্ভগৃহে।
মনে মনে ভাবি, বিশাল এই ভারতবর্ষের ধর্মবিশ্বাসী মানুষদের কত শতাংশ ভিআইপি লাইনে দাঁড়িয়ে পুজো দিতে পারেন! ঈশ্বর দর্শনের ব্যাপারটিও তাহলে শ্রেণী নিরপেক্ষ নয়। পুঁজিও একটা পার্থক্য গড়ে দিতে পারে।
কামাখ্যা মন্দির দেখে আমরা এবার শিলং-এর পথ ধরলাম। নীলাচল পাহাড় থেকে আঁকাবাঁকা পথে নেমে গাড়ি ছুটল গুয়াহাটি–শিলং হাইওয়ে ধরে। পেছনে পড়ে রইল গুয়াহাটি। গুয়াহাটি থেকে শিলঙের দূরত্ব মোটামুটি একশ কিলোমিটার। যেতে ঘণ্টা তিনেক লাগার কথা। তবে আমরা কিছু জায়গা ঘুরে তারপরে যাব। তাই, স্বাভাবিকভাবেই আমাদের সময় বেশি লাগবে।
হাইওয়ে ধরে পাঁচ–সাত কিলোমিটার এগোতেই রাস্তার ডানদিকে শুরু হয়ে গেল মেঘালয়। বা দিকে তখনও আসাম। রাস্তাটাই বলতে গেলে সীমানা। আমরা সেই সীমানা ধরে এগিয়ে চলেছি। একসময় মেঘালয় আর আসাম নিয়েই ছিল আসাম রাজ্য। ১৯৭০ সালের এপ্রিল মাসের ২ তারিখে মেঘালয়কে স্বশাসিত রাজ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয় এবং তারপর ১৯৭২ সালের ২১শে জানুয়ারী গারো, খাসি আর জয়ন্তিয়া পাহাড় সংলগ্ন অঞ্চল নিয়ে গড়ে ওঠে পৃথক মেঘালয় রাজ্য। তার আগে শিলং ছিল অবিভক্ত আসামের রাজধানী। ‘মেঘালয়’ নামকরণের ক্ষেত্রে জড়িয়ে আছে এক বাঙালির নাম— অধ্যাপক ডঃ শিবপ্রসাদ চট্টোপাধ্যায়। তিনি ছিলেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভূগোল বিভাগের প্রাক্তন বিভাগীয় প্রধান।
মেঘালয়ে পেট্রোলের দাম কম হওয়ায় ড্রাইভারদাদা গাড়িটাকে একটা জায়গা দিয়ে ডানদিকে নিয়ে গিয়ে মেঘালয়ের মধ্যে ঢুকে একটা পাম্প থেকে পেট্রোল ভরে নিলেন। জোড়াবাট নামের জায়গাটা পেরোনোর পর বুঝতে পারলাম যে আমরা ক্রমশ ওপরে উঠছি। কালো আঁকাবাঁকা পিচরাস্তা। একেবারে মাখনের মতো। জনবসতি কমে আসছে ধীরে ধীরে। দুই পাশে সবুজ পাহাড়। খুব উঁচু নয় যদিও। বড় বড় গাছের ফাঁক দিয়ে রাস্তার ওপর খেলা করছে শীতকালের সূর্যের নরম আলোছায়া।
কথায় আছে, Journey is more important than destination। আমরা সেই ‘জার্নি’ উপভোগ করতে করতে চলেছি মেঘালয়ের পথে। যত সামনে এগোচ্ছি তার অপরূপ সৌন্দর্যের আভাস আরও বেশি করে পাচ্ছি। একটা জিনিস খেয়াল করলাম যে, আবহাওয়া ধীরে ধীরে ঠাণ্ডা অথচ মনোরম হয়ে আসছে। গুয়াহাটিতে ঠাণ্ডা ছিল বেশ। কিন্তু মনোরম মোটেই লাগছিল না। আমরা এখন পুরোপুরি মেঘালয়ের মধ্যে ঢুকে পড়েছি। অর্থাৎ, বাম দিকেও মেঘালয়, ডান দিকেও মেঘালয়। যত শিলঙের দিকে যাচ্ছি, ততই যেন টের পাচ্ছি মনোরম আবহাওয়া আসলে কাকে বলে। সাধে কি আর মেঘালয়কে বলে ‘প্রাচ্যের স্কটল্যান্ড’!
সুন্দরী মেঘালয়। স্বপ্নের মেঘালয়। মোহময়ী মেঘালয়।
মাঝে এক জায়গায় দাঁড়ালাম জলখাবার খাওয়ার জন্য। সকালে সেই এক কাপ কফি ছাড়া আর কিছু খাইনি। রাস্তার ধারেই ধাবা। অনেক টুরিস্ট গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে সেখানে। আমরা সেখানে জলখাবার খেয়ে আবার রওনা দিলাম।
পাহাড়ি অঞ্চল হলেও রাস্তায় চড়াই উৎরাই কম। বাঁকগুলোও অতো ভয়ংকর নয়। ফলে অনেকটা নিশ্চিন্তেই প্রকৃতিকে উপভোগ করতে করতে যাওয়া যায়। এই রাস্তা দিয়েই ১৯০১ সালে স্বামী বিবেকানন্দ শিলং গিয়েছিলেন টাট্টু ঘোড়ার গাড়িতে করে। তখন বাস বা মোটর চালিত গাড়ি চলত না এই রাস্তায়। যেতে নাকি তিনদিন সময় লেগেছিল। আর এই ২০২৪ সালে আমাদের লাগবে তিন ঘণ্টা।
এই শিলং-গুয়াহাটি রোড তৈরি হওয়ারও একটা ইতিহাস আছে। তার জন্য ফিরে যেতে হবে পূর্বতন আসামে।
তখন ঊনবিংশ শতাব্দীর শুরুর দিক। ১৮১৭ থেকে ১৮২৬ সালের মধ্যবর্তী সময়ের কথা। অবিভক্ত ভারতবর্ষে ব্রিটিশ শাসন চলছে। সেই সময়ে তো আলাদা করে মেঘালয় বলে কিছু ছিল না। মেঘালয়, মিজোরাম, নাগাল্যান্ড, অরুণাচল প্রদেশ এমনকি বর্তমান বাংলাদেশের সিলেটও আসামেরই অন্তর্ভুক্ত ছিল। স্বাধীন আসামে তখন অহম রাজারা সাম্রাজ্য চালাচ্ছেন। ইংরেজরা সেখানে আধিপত্য বিস্তার করেনি তখনও। সম্ভবত তৎকালীন আসামের এক বিরাট অংশ পাহাড়ি অঞ্চল ছিল বলেই ইংরেজরা তেমন উৎসাহ দেখায়নি সেখানে সাম্রাজ্য বিস্তারের। সমতলেই তাদের প্রভাব সীমাবদ্ধ ছিল। পূর্বতন আসামের দক্ষিণে তখন অবিভক্ত বঙ্গদেশ। দুই বঙ্গেই তখন ব্রিটিশদের বিরাট প্রভাব। সাবেক আসামের পূর্বদিকে ছিল বর্মা দেশ, অর্থাৎ এখনকার মায়ানমার।
ওই সময়ে অহম সাম্রাজ্যের দুর্বলতা এবং অন্তর্দ্বন্দ্বের সুযোগ নিয়ে তৎকালীন বর্মা রাজা বোদাওপায়ার সময়ে বর্মা বাহিনী ১৮১৭ সাল থেকে ১৮২১ সালের মধ্যবর্তী সময়ে তিনবার স্বাধীন আসাম সাম্রাজ্য আক্রমণ করেন। এরপর ১৮২১ থেকে ১৮২৪ সাল পর্যন্ত টানা তিনবছর আসাম বর্মা রাজের অধীনে থাকে। এই তিনবছর ধরে চলে ব্যাপক অত্যাচার এবং লুটপাট। বর্মার মানুষরা অসমীয়দের কাছে ‘মান’ নামে পরিচিত ছিল। তাই তিনবছরের এই বর্মা রাজত্বকালকে আসামের ইতিহাসে ‘মানোর দিন’ নামে অভিহিত করা হয়। এরপর তৎকালীন অহম রাজা চন্দ্রকান্ত সিং ব্রিটিশদের কাছে সাহায্য প্রার্থনা করলে বর্মা এবং ব্রিটিশদের সরাসরি যুদ্ধ বাধে। এবং ১৮২৬ সালে ‘ইয়ান্দাবুর সন্ধি’ দ্বারা প্রথম ইঙ্গ-বর্মা যুদ্ধের সমাপ্তি হয়। এই সময় থেকেই আসাম তথা উত্তর পূর্ব ভারতে ব্রিটিশদের আধিপত্য প্রতিষ্ঠিত হয় এবং ব্রিটিশরা ডেভিড স্কটকে আসামের প্রশাসক হিসাবে নিযুক্ত করে।
আসামকে নিজেদের অধীনে আনার পর ইংরেজরা বুঝতে পারে যে ব্রিটিশ সাম্রাজ্য রক্ষা এবং বিস্তারের জন্য বঙ্গদেশের সাথে আসামের যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতি সাধন আশু প্রয়োজন। বঙ্গদেশের থেকে আসাম বিচ্ছিন্ন হয়ে রয়েছে প্রাচীরের মতো দাঁড়িয়ে থাকা খাসি পাহাড়ের মাধ্যমে। তখন ডেভিড স্কটের নেতৃত্বে গুয়াহাটি থেকে বঙ্গদেশের শ্রীহট্ট পর্যন্ত একটা রাস্তা তৈরির পরিকল্পনা করা হয়। এরপর খাসিয়াদের সিয়েম বা রাজা তিরৎসিং খাসিয়া পাহাড়ি অঞ্চলের মধ্যে দিয়ে এই রাস্তা তৈরিতে সায় দিলে এই রাস্তা তৈরির কাজ শুরু হয়।
কিন্তু এই রাস্তা তৈরির সময়েই খাসিয়াদের মধ্যে একটা কথা রটে যায় যে, এই রাস্তা তৈরি হলে ইংরেজরা সমগ্র খাসিয়া পাহাড় দখল করে খাসিয়া মানুষদের ওপর কর বসাবে। এতে স্বাধীনতা প্রিয় খাসিয়া উপজাতির মানুষরা সংঘবদ্ধ হয়ে ইংরেজদের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ান। এই রাস্তা তৈরির সময়েই ১৮২৯ সালের এপ্রিল মাসে একদিন খাসিয়া মানুষরা তীর–ধনুক নিয়ে ইংরেজদের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। এতে দুজন ইংরেজ সহ অনেক শ্রমিক নিহত হন। এরপর এই সংঘর্ষ যুদ্ধের রূপ নেয়। তীর–ধনুক নিয়েই তাঁরা ব্রিটিশদের আধুনিক অস্ত্রশস্ত্রের বিরুদ্ধে মরণপণ যুদ্ধ করেন।
এরপর ১৮৩৩ সালে ইংরেজ ও খাসিয়াদের মধ্যে এক সন্ধি স্থাপিত হয় এবং সেই সন্ধি দ্বারা ব্রিটিশরা খাসিয়াদের স্বাধীনতা স্বীকার করে নেয়। আর তারপর আবার সেই রাস্তার কাজ শুরু হয়। প্রায় দুশো বছরের পুরনো সেই রাস্তা দিয়েই পাহাড়ের গা বেয়ে আমরা শিলঙের দিকে চলেছি।
আমাদের ড্রাইভারদা খুব মজার মানুষ। নানা রকম মজার কথা বলে নিজেই মাতিয়ে রাখছিলেন। মাতৃভাষা অসমিয় হলেও বাংলা বুঝতে এবং বলতে পারেন। বাংলাতেই বলছিলেন তিনি। নতুন ভাষা শেখার এবং বোঝার ইচ্ছা আমার অনেকদিনের। যদিও বাংলা ছাড়া আর কোনও কিছুই অনর্গল বলতে পারি না। ইংরাজি আর হিন্দিটা কিছুটা এবং বলতে পারি। আমি বললাম, “ভিকি দা, তুমি অসমীয়া ভাষাতেই কথা বল। বাংলা আর অসমীয়া ভাষায় অনেক তো মিল আছে। তুমি কথা বললে আমরাও শেখার বা বোঝার চেষ্টা করব। যেটা নেহাত বুঝতে পারব না, সেটা তুমি বাংলায় বুঝিয়ে দেবে।” ভিকিদার সাথে তখন আমাদের এতই সখ্যতা হয়ে গেছে যে, আপনি থেকে তুমিতে নেমে এসেছি।
ভিকিদা আমার কথা শুনে হাসলেন। কিন্তু কেন জানি না তিনি বাংলাতেই কথা বলছিলেন। আমার প্রস্তাবটা গ্রহণ করলেন না। অগত্যা! আমার সবেধন নীলমণি প্রাণের বঙ্গভাষা। সুযোগ পেয়েও আসামের গাড়িগুলোর পেছনে লেখা “জয় আয়ি আসাম” (পড়তে হবে ‘জয় আয়ি অহম’) ছাড়া আর নতুন কিছু শিখতে পারলাম না। ‘আয়ি’ মানে মা। বাংলায় কথাটা এরকম দাঁড়াবে, আমার মাতৃভূমি আসামের জয়। মনে মনে বলি, জয় বঙ্গভূমি। জয় বঙ্গভাষা।
অনেকটা এগোনোর পর ডানদিকে দেখি বিরাট জলাশয়। দীঘির মতো টলটলে নীল জল। নয়নাভিরাম দৃশ্য। আহা! চোখ যেন জুড়িয়ে গেল। উমিয়াম লেক। খাসি ভাষায় ‘উমিয়াম’ শব্দের অর্থ চোখের জল। স্থানীয় খাসিয়া কিংবদন্তি অনুযায়ী, স্বর্গ থেকে দুই সহোদরা ভ্রমণের উদ্দেশ্যে মর্ত্যে নেমে আসেন। কিন্তু পথে এক বোন হারিয়ে যান এবং অপরজন এই মেঘের দেশে এসে পৌঁছান। হারিয়ে যাওয়া বোনের দুঃখে অপর সেই বোনের কান্নার দ্বারা উদ্ভূত চোখের জলে এই জলাধারের সৃষ্টি। তাই এর এমন নাম। কিন্তু আসলে মেঘালয়ের রি-ভোই (Ri Bhoi) জেলায় অবস্থিত এই উমিয়াম জলাধারটি ১৯৬৫ সালে মনুষ্যসৃষ্ট। তবে আগে থেকেই হয়তো কোনও জলাশয় ছিল ওই জায়গায়। তবুও স্থানীয় উপকথার গল্প শুনতে বেশ ভালই লাগে।
আমার মতে, শিলঙের সবচেয়ে সুন্দর জায়গা এটি। সার বেঁধে অনেক গাড়ি দাঁড়িয়ে আছে। ডানদিকে উমিয়াম লেক। উমিয়াম ড্যামের ওপর দিয়ে এগোতে গিয়ে দেখলাম বা দিকটা একদম জলশুন্য। পাহাড়ের গা দেখা যাচ্ছে সেখানে। ড্যামের মাধ্যমে জল ধরে রেখে শিলং শহরের জন্য জলবিদ্যুৎ উৎপাদন করা হয়।
গাড়ি হঠাৎ মূল রাস্তা থেকে নেমে আর একটা গাছপালা ঘেরা অপেক্ষাকৃত সরু রাস্তার মধ্যে ঢুকল। তারপর একটু এগিয়ে গাড়ি থেকে নেমে আমরা হেঁটে গেলাম একদম লেকের ধারে। উমিয়াম লেকের নাম এখানে ‘অর্কিড লেক’। এন্ট্রি ফি আছে। ত্রিশ টাকা মাথাপিছু। অপূর্ব সুন্দর জায়গা। লেকের ধারে লম্বা লম্বা পাইন গাছ। নিস্তব্ধ নিশ্চুপ। প্রকৃতি নিজেই যেন ধ্যানে বসেছেন। লেকের ধার দিয়ে গাছের মধ্যে দিয়ে হাঁটতে খুব ভাল লাগবে। ওপরে নীল আকাশ। দূরে হালকা সাদা কুয়াশাচ্ছন্ন সবুজ পাহাড়। পাহাড়ের পেছনে ঝুপ করে আকাশটা মিশে গেছে। সব মিলিয়ে যেন পটে আঁকা ছবি। সত্যিই, প্রকৃতির এমন রূপ দেখে মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকা ছাড়া আর কিছু করার থাকে না। একটা চেয়ার নিয়ে লেকের দিকে মুখ করে সারাদিন বসে থাকতেও একফোঁটা বিরক্তি অনুভূত হবে না। স্পীড বোটে করে লেক ঘুরে দেখার ব্যবস্থাও আছে। থাকার জন্য আছে রিসর্ট। গাছের মধ্যে দিয়ে একটু উঁচুতে অনেকটা লম্বা একটা ঝুলন্ত পায়ে হাঁটার ব্রিজও আছে। কিন্তু এখন পরিত্যক্ত। কাউকে উঠতে দেওয়া হয় না। ঝুলন্ত ব্রিজটা চালু থাকলে ব্যাপারটা বেশ হতো।
আমাদের গাড়ি আবার ছুটে চলল শিলঙের দিকে। সার বেঁধে গাড়ি চলেছে। কেউ কাউকে ওভারটেক করে না। কোনও গাড়ি হর্ন বাজায় না। কোনও ট্র্যাফিক পুলিশ নেই। সবকিছু যেন চলছে একটা ছন্দে। পুরো ব্যাপারটাই যেন একটা কবিতা। এই পথ চলায় কোনও একঘেয়েমি নেই। নেই কোনও অস্বস্তি। গাছপালা পাহাড়ের মধ্যে দিয়ে আমরা যেন অনন্তের পথে চলেছি।
আমরা মূল শিলং শহরে প্রবেশ করেছি। রাজধানী শহর হওয়ায় জনসমাগম ভালই। শিলঙের আগের নাম ছিল লিউদু (Lewduh), যার অর্থ বড় বাজার। তারপর শিলং পিকের নাম থেকে শহরের বর্তমান নামকরণ।
আমাদের এবারের গন্তব্য শিলঙের বিখ্যাত এয়ারফোর্স মিউজিয়াম। এখানেও মাথাপিছু চল্লিশ টাকা দিয়ে পরিচয়পত্র দেখিয়ে ঢুকতে হল। বিভিন্ন যুদ্ধ বিমান, যন্ত্রপাতি, মিসাইলের রেপ্লিকা, ব্যবহৃত বন্দুক, পোশাক ইত্যাদি এখানে রাখা আছে। বর্ণিত আছে এয়ারফোর্সের সাফল্যের কাহিনী। আছে সব চিফ এয়ার মার্শালদের নামের তালিকা। ১৯৭১ এর যুদ্ধ থেকে কার্গিল বিজয়— অনেক তথ্য এবং ছবি সেখানে ধরা আছে। দেখতে বেশ ভালই লাগবে। এছাড়াও ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্যগুলির সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যও তুলে ধরা হয়েছে আলাদা ভাবে।
এরপর চললাম এলিফ্যান্ট ফলস দেখতে। এদিকে কথায় কথায় বেলা গড়িয়ে গেছে অনেক। পেটের ভেতর ছুঁচোয় ডন দিচ্ছে। এয়ারফোর্স মিউজিয়াম দেখে সোজা রাস্তা ধরে ধুলো উড়িয়ে এগোচ্ছে আমাদের গাড়ি। রাস্তায় যানজট আছে বেশ। মাথার ওপরে হেলিকপ্টারের আওয়াজ শোনা যাচ্ছে এক টানা। সবসময় যেন টহল দিচ্ছে। ড্রাইভার দাদা বললেন, পাহাড়ের ওপরে এয়ারফোর্সের ক্যাম্প আছে।
এলিফ্যান্ট ফলস দেখার জন্য মাথা পিছু একশ টাকা দিয়ে ঢুকতে হল। বেশ ভিড় ছিল জায়গাটায়। ঝর্ণার নামটা শুনেই মনে প্রশ্ন জাগে যে, এমন নাম কেন! হাতির সাথে এর কী সম্পর্ক? এই অঞ্চলে কি হাতি ছিল কোনও এক সময়ে? জল খেতে আসত এখানে? এমন নানা সব প্রশ্ন মনের মধ্যে বুড়বুড়ি কাটছিল। দেখলাম, ঢোকার মুখেই এই সব প্রশ্নের উত্তর দেওয়া আছে লিখিত ভাবে।
এই অঞ্চলটি মেঘালয়ের পূর্ব খাসি হিলস জেলার অন্তর্গত। স্থানীয় খাসি ভাষায় এই ঝর্ণার নাম ‘ka kshaid lai pateng khohsiew’ অর্থাৎ, তিন ধাপবিশিষ্ট জলপ্রপাত। কথাটির সঠিক উচ্চারণ আমার অজানা। তাই যেমন লেখা ছিল, তেমন ইংরেজি হরফেই লিখলাম। এই প্রসঙ্গে একটা কথা বলে নেওয়া ভাল। খাসিয়াদের ভাষা সুপ্রাচীন হলেও তাঁদের ভাষার নিজস্ব কোনও লিপি বা লিখিত বর্ণমালা নেই। আসলে, ভাষার মূল উদ্দেশ্য হল মনের ভাব প্রকাশ করা। আর এইসব পাহাড়ি মানুষদের মধ্যে যেহেতু প্রথাগত শিক্ষার চল ছিল না প্রথমে, তাই লিখিত লিপি বা বর্ণমালার প্রয়োজনও অনুভূত হয়নি। সংযোগ রক্ষার জন্য মুখের ভাষাই যথেষ্ট ছিল। খ্রিস্টান মিশনারিরা এই অঞ্চলের মানুষদের মধ্যে শিক্ষা বিস্তারের চেষ্টা করলে লিখিত বর্ণমালার প্রয়োজন হয়ে পড়ে। কিন্তু খাসিয়া ভাষার নিজস্ব লিপির অভাবের জন্য ইংরেজি বর্ণমালার মাধ্যমে খাসিয়া ভাষার লেখ্যরূপের প্রচলন শুরু হয়। অনেকটা আজকালকার সোশ্যাল মিডিয়ার যুগে ‘বাংলিশ’ লেখার মতো। তারপর থেকে সেভাবেই চলছে।
জলধারাটি তিনটি ধাপে বিভক্ত। ‘এলিফ্যান্ট ফলস’ নামটি আসলে ব্রিটিশদের দেওয়া। ওখানে নাকি একটা বড় পাথর ছিল যেটা অনেকটা হাতির মতো দেখতে। সেই পাথরের আকৃতি থেকেই এই নাম। কিন্তু ১৮৯৭ সালে এক ভুমিকম্পের দ্বারা পাথরটি নষ্ট হয়ে যায়। কিন্তু তারপরেও নামের ক্ষেত্রে কলোনিয়াল ছাপটি বহন করে আসছে ঝর্ণাটি।
আগেই লিখেছি ঝর্ণাটি তিনটি ধাপে বিভক্ত। নীচ থেকে ধাপে ধাপে ওঠার সময়েই জলধারার শব্দ পাচ্ছি। মনটা নেচে উঠল আনন্দে। প্রথম ধাপটি একটু দূরে গাছপালার ভেতর। দেখতে যদিও তেমন অসুবিধা হবে না। কিন্তু ঝর্ণার এ কি অবস্থা! শীতকাল বলেই বোধহয় জলধারা তেমন জোরাল নয়। নাহ্, মনের আশ মিটল না!
দ্বিতীয় ধাপে দেখা যাক। যত উপরে উঠছি বারিপতনের শব্দ বাড়ছে। পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে আরও একটু ওপরে উঠে দ্বিতীয় ধাপ। কিন্তু জলের ধারা এখানে আরও ক্ষীণ! ওখানে দাঁড়িয়েই শুনতে পাচ্ছিলাম ওপরে জলের শব্দ। তাহলে আরও একটু ওপরে থাকা তৃতীয় ধারাটা কি পূরণ করবে সাধ?
পাথুরে ধাপ বেয়ে উঠতে থাকলাম। বয়স্ক মানুষদের ক্ষেত্রে একদম উঁচু পর্যন্ত যাওয়া মুশকিল। মিনিট দুয়েক উঠতে হল। তারপরেই এলিফ্যান্ট ফলসের তৃতীয় তথা শেষ ধাপ। জলের ধারা এখানে অনেকটা চওড়া। ওপর থেকে একটানা নীচে পাথরের ওপর এসে পড়ছে জলরাশি। জল জমে সামনে তৈরি হয়েছে একটা জলের কুণ্ড। বেশ ঠাণ্ডা ঠাণ্ডা ভাব। দাঁড়িয়ে থাকতে বেশ ভালই লাগছিল এখানে।
কিন্তু বেলা দুপুর পেরিয়ে গেছে অনেকক্ষণ। সকালের সেই জলখাবার হজম হয়ে কোথায় যে চলে গেছে কে জানে! আমি ‘অন্নপায়ি বঙ্গবাসী’। অতএব, পেটপুজো আশু প্রয়োজন। আরও কিচ্ছুক্ষণ ঝর্ণা ধারা চাক্ষুষ করে আবার সেই পাথুরে সিঁড়ি বেয়ে ধাপে ধাপে নেমে এলাম। বাইরেই আছে বেশ কয়েকটা হোটেল। ঢুকে পড়লাম একটায়। খাওয়াদাওয়া সেরে আবার রওনা দেব। এবার গন্তব্য শিলঙের উচ্চতম স্থান, শিলং পিক।
গাড়ি স্টার্ট করার আগে ড্রাইভারদাদা হঠাৎ বললেন, “আরে, তিনটে তো বেজে গেছে। এখন তো আর ঢুকতে দেবে না। তিনটের মধ্যে শিলং পিক দেখার জন্য যেতে হয়। আমার তো মনেই ছিল না একদম।” অগত্যা! বাদ দিতে হল শিলং পিক দেখার বাসনা। ঠিক হল, পরে অন্য দিন যদি সময় পাওয়া যায়, তখন যাওয়া হবে। তবে সে সময় আমাদের আর হয়নি।
এবার সোজা হোটেল। হোটেলটা মূল শিলং শহর থেকে একটু দূরে। শিলঙের বিখ্যাত পুলিশ বাজার থেকে প্রায় দশ কিলোমিটার। বেশ ফাঁকা ফাঁকা জায়গা। দূরে উঁচু পাহাড়ের সারি। বেশ পছন্দ হয়ে গেল হোটেলটা। এবার বিশ্রাম নেওয়ার পালা। (ক্রমশ...)
