Mr.Khajuraho - Curated Global Insights. Stories That Matter.
Return to Archives
✦ ARCHIVE DISPATCH № KH-3913READING TIME: 13 MIN
#Cultural#Socio-Cultural

মেঘমুলুকের আবছায়াতে (দ্বিতীয় পর্ব)

Aug 15, 2026Chronicled by অর্ণব মণ্ডল 569 Reader Explorations
মেঘমুলুকের আবছায়াতে (দ্বিতীয় পর্ব)
ARCHIVAL FIELD PLATE I — মেঘমুলুকের আবছায়াতে (দ্বিতীয় পর্ব)AUTHENTICATED RECORD
REFERENCE WIRE: প্রথম পর্বের লিঙ্কhttps://www.mrkhajuraho.com/post/6a7d560d77dff9cd19500fd9
Inspect Link ↗

রদিন সকাল সাতটার সময় জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম। আমাদের আজকের গন্তব্য ডবল ডেকার রুট ব্রিজ। রাতে শিলং ফিরব না। থাকব চেরাপুঞ্জিতে। মেঘালয় পূর্ব দিকের রাজ্য হওয়ায় এখানে ভোর হয় অনেক তাড়াতাড়ি। পরিষ্কার আকাশ আর রৌদ্রজ্জ্বল সকালে গাড়ি ছুটছে চেরাপুঞ্জির দিকে। দুই পাশে ফাঁকা জায়গা, কোথাও টিলা এবং উচ্চভূমিও চোখে পড়ছে। দূরে পাহাড়ের সারি। কোথাও কুলকুল করে বয়ে চলেছে পাহাড়ি নদী, কোথাও আবার তিরতিরে ঝর্ণা। পরিবার নিয়ে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে পাইন গাছেরা। মাথা দোলাচ্ছে আপনমনে। মাঝে মাঝে ছোট ছোট খাসিয়া মানুষদের গ্রাম, দোকানপাট। প্রায় প্রতিটা বাড়িতেই আসন্ন খ্রিস্টমাস উপলক্ষে রয়েছে আলোকসজ্জা। আগেরদিন আসার সময় শিলঙের রাস্তায় দেখেছিলাম গান গাইতে গাইতে উৎসবের মেজাজে হেঁটে যাচ্ছে অনেক মানুষ। ড্রাইভার দাদা বললেন, বড়দিনের সপ্তাহে খুব সুন্দর ভাবে সেজে উঠবে এই রাজ্য। হবে নানা অনুষ্ঠান। আমরা এসেছি বড়দিনের আগের সপ্তাহে। তাই যা দেখতে পাই, সেটাই বড় পাওনা।

যেতে যেতে দেখছি স্থানীয় খাসি মানুষদের সরল মায়ামাখা হাসিখুশি মুখের আনাগোনা। এখানে বেশীরভাগ মহিলারা গাউন জাতীয় পোশাক পরেন। এবং তার ওপরে পরেন প্রথাগত রঙবেরঙের আর একটা আলোয়ানের মতো কাপড় বিশেষ। খাসিয়া ভাষায় এর নাম ‘Jainkyrshah’ (উচ্চারণ অনেকটা এমন— জৈনকরশাহ্)। এটা জেনেছিলাম ফিবানের কাছ থেকে। ফিবানের সাথে আজই আমার পরিচয় হবে। এখানে ছোট বাচ্চাদের সাধারণত কোলে না নিয়ে পিঠে বেঁধে নেওয়া হয়। দোকানগুলো সাধারণত মহিলারাই চালান। মেঘালয়ের সমাজ ব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক। প্রায় সব মহিলাই বাড়ির বাইরের কোনও কাজে নিযুক্ত থাকেন। উপার্জন করেন নিজের মতো। সংসার চালান সেই উপার্জনে। নিজেদের জীবনের সিদ্ধান্ত তারাই নেন। মায়ের সম্পত্তি বংশ পরম্পরায় মেয়েরাই ভোগ করে। আমাদের এখানকার সমাজব্যবস্থার সাথে এর কোনও মিল নেই।

শিলং থেকে চেরাপুঞ্জি আরও ওপরে। ফলে আমরা ওপরের দিকে উঠছি। অপূর্ব পরিবেশ। মসৃণ রাস্তা। গাড়ির মিউজিক সিস্টেমে হালকা সুরে একের পর এক বাজছে কিশোর রফি মান্না। মনোরম মেঘালয়। মনোহর মেঘালয়।

যাত্রাপথে কোথাও কোনও সুন্দর জায়গা দেখলেই দাঁড়িয়ে পড়ছি। কোথাও মাল্ভুমিময় বিস্তীর্ণ খোলা মাঠ। মাথার ওপর ওলটানো গামলার মতো নীল আকাশ। চারিদিকে ছোটবড় পাথর। কোথাও আবার ছায়াঘেরা নিঝুম পরিবেশ। চারিদিকে শুধু সবুজ পাহাড় আর নাম-না-জানা পাখির ডাক। এমনই একটা জায়গা ছিল ‘ডিমপেপ ভ্যালি’ (Dympep Valley)। আরও অনেক জায়গাতেই দাঁড়িয়েছি। কিন্তু এটার নামটা উল্লেখ করলাম কারণ, জায়গাটার নাম লেখা ছিল একটা প্রস্তর ফলকে। রাস্তার ডান দিকে উঁচু পাহাড়ের গা। আর বা দিকে সবুজ পাহাড় গা ঘষাঘষি করে দাঁড়িয়ে আছে পরপর। কী যে সুন্দর দৃশ্য! নীচের দিকে তাকিয়ে দেখলাম অনেকটা নীচে পাহাড়ের পাদদেশ দেখা যাচ্ছে। সেখানে রয়েছে একটা সরু পাহাড়ি নদী। টুরিস্টদের জন্য দড়ি ধরে ঝুলে ঝুলে এপাশ থেকে ওপাশের পাহাড়ে যাওয়ার জন্য রোপওয়ের মতো ব্যবস্থাও আছে। রাস্তার ধারে স্থানীয় মহিলারা ভুট্টা, মোমো বিক্রি করছেন। কপালের সাথে বেঁধে পিঠে লম্বাটে ঝুড়ি সদৃশ্য পাত্রে জিনিসপত্র নিয়ে রাস্তার ধার দিয়ে গন্তব্যে যাচ্ছেন অনেক স্থানীয় খাসিয়া মহিলা।

আবার চলা শুরু। গন্তব্য এখনও বেশ কিছুটা দূরে। আমরা ক্রমশ উপরে উঠছি। পাহাড়ের ঢালে ধাপে ধাপে হয়েছে ধাপ চাষ। সেখানে ফলেছে শীতকালীন সবজি। পাহাড়ি অঞ্চলে ঝুম চাষও হয়। জমির আগাছা পুড়িয়ে সেই ছাই মাটিতে জমে মাটির উর্বরতা সাময়িক ভাবে বৃদ্ধি পায়। তখন চাষ করা হয় সেই জমিতে। ভূগোল বইতে সেই কোন ছোটবেলায় পড়েছি যে, পাহাড়ি অঞ্চলের অপেক্ষাকৃত অনুর্বর পাথুরে জমিতে এভাবেই চাষের ব্যবস্থা করা হয়। বইয়ের পাতায় যা পড়েছি, তা দেখছি প্রকৃতির পাতায়। প্রকৃতির চেয়ে বড় শিক্ষক কি আর কেউ আছে?

মাঝে মাঝে কয়েকঘর বসতি নিয়ে ছোট গ্রাম। পাহাড়ের ধাপে পাইন গাছের মধ্যে অনেক জায়গাতেই দেখছি সার বেঁধে রাখা আছে ছোট ছোট আয়তঘনকার বাক্স বিশেষ। সাথে ক্রশ। বুঝলাম কবরস্থান। রঙবেরঙের ফুল ফুটে আছে সেখানে। এই দৃশ্য দেখতে দেখতে প্রায় কুড়ি-বাইশ বছর আগের ‘দাদাঠাকুর’ ছবির একটা গানের কথা মনে পড়ল,

“এই মাটিতে জন্ম ওরে মাটিতে মরণ

ভালোবাসা দিবি নিবি থাকবি যতক্ষণ…”।

নিজেকে কেমন যেন উদাস লাগছিল। মেঘালয়ের বাতাস যেন নির্মোহ করে দিল আমাকে। সেই উদাসী আমাকে নিয়েই এগিয়ে চলেছে গাড়ি। পাহাড়ের গা বেয়ে ঘুরে ঘুরে চলেছি আমরা নংরিয়েত গ্রামে। যেখানে আছে রবার গাছের শিকড় দিয়ে তৈরি দোতলা ব্রিজ। শিলং থেকে প্রায় ষাট কিলোমিটার যার দূরত্ব।

গাড়ি থেকে যখন নামলাম তখন বেলা দশটা বাজে। গ্রামটির নাম মওলাখিয়েত। এখান থেকে নংরিয়েত গ্রামে রুট ব্রিজ দেখতে বাকি পথটা পাহাড়ের গা বেয়ে হেঁটে যেতে হবে। গাড়ি থেকে নামতেই চারিদিক থেকে ছেঁকে ধরল স্থানীয় খাসিয়া কচিকাঁচার দল। তাদের কাছ থেকে বাঁশের লাঠি কিনতে হবে। রুট ব্রিজ পর্যন্ত যেতে লাঠি থাকলে পাহাড়ের ধাপ বেয়ে নামতে সুবিধা হবে। তাদের কাছ থেকে লাঠি নিয়ে আরও কিছুটা এগোতেই আবার ঘিরে ধরল কয়েকজন স্থানীয় মানুষ। তাঁরা গাইড হিসাবে সাথে যেতে চান। তাঁদের থেকেই জানলাম একঘণ্টার বেশি সময় লাগবে মূল জায়গায় পৌঁছাতে। টুরিস্টদের জন্য একেবারে দুর্গম না হলেও, খুব সুগম নয়।

ফিবানকে আমরা নিলাম আমাদের গাইড হিসাবে। ওর নামটা তখনও অবশ্য জানতাম না। তখনও এও জানতাম না যে, এই দিনটা আমার জীবনের অন্যতম স্মরণীয় একটা দিন হতে চলেছে।

পাহাড়ের ধাপ বেয়ে নামতে শুরু করলাম। কোথাও সিমেন্ট বাঁধিয়ে সিঁড়ি করা আছে, কোথাও শুধুই পাথরের ধাপ। চারিদিকে গাছপালার জঙ্গল। ফিবান চলেছে আগে আগে । আমরা পেছনে। ওকে দেখে একেবারে বাচ্চা মনে হয়েছিল প্রথমে। কিন্তু পরে জানলাম, সে ক্লাস নাইনে পড়ে। তবুও বাচ্চাই। পরীক্ষা শেষে স্কুল ছুটি, তাই টুরিস্ট গাইডের কাজটা করে। তার ভাল লাগে পাহাড়ে পাহাড়ে ঘুরতে। ওর সাথে কথা হচ্ছিল ইংরেজিতেই। আমি যদিও ইংরেজিতে কথা বলার ক্ষেত্রে একেবারেই পারদর্শী নই। তবুও কাজ চালানোর মতো তো জানি। তাতেই কথা বলছিলাম ফিবানের সাথে।

মেঘালয়ে একটা জিনিস প্রথম থেকেই দেখেছি, স্থানীয় ভাষা ছাড়া সবকিছু ইংরেজিতেই চলে। বাচ্চা থেকে বুড়ো, সবাই ইংরেজি বোঝে। এর একটা কারণ বুঝলাম ফিবানের কথা শুনে। ওদের স্কুলে পড়াশোনার মাধ্যম ইংরেজি। আর তাছাড়া খাসি ভাষা লেখা হয় ইংরেজি বর্ণমালা ব্যবহার করে। এদিকে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বী অনেক মানুষ আছেন। ঘন ঘন চোখে পড়ে চার্চ এবং চার্চ সংলগ্ন স্কুল। ফলে ইংরেজি এদিকে খুব চলে। মেঘালয়ের স্কুল নিয়ে একটা খবর কদিন আগে চোখে পড়েছিল কাগজের পাতায়। মেঘালয়ে জনসংখ্যার অনুপাতে স্কুলের সংখ্যা অনেক বেশি। অনেক স্কুলে নাকি ছাত্রছাত্রীই নেই বা খুব কম।

২০১১ সালের জনশুমারির তথ্য অনুযায়ী মেঘালয়ে খ্রিস্টান ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা চুয়াত্তর শতাংশ। মেঘালয়ের সাতটি জেলার প্রত্যেকটিতেই খ্রিস্ট ধর্মাবলম্বীর সংখ্যা বাকিদের চেয়ে বেশি। কিন্তু নেই কোনও সঙ্খ্যাগুরুবাদের আস্ফালন।

আমরা নীচের দিকে নামছি। ফিবান নামছে বেশ দ্রুত গতিতে। আমি বললাম, “ফিবান, প্লিজ, একটু ধীরে নামো। আমরা তোমার সাথে তাল রাখতে পারছি না। একটু দয়া করো আমাদের মতো বৃদ্ধ মানুষগুলোকে।“

ফিবান খুব মজা পেল। হেসে বলল, “তোমরা বুড়ো নাকি?”

আমি বললাম, “তোমার তুলনায় তো বুড়ো।“

ফিবান হাঁটার গতি কমিয়ে দিল। তার হাতেও একটা লাঠি। প্রথমে যখন নাম জিজ্ঞাসা করেছিলাম, ও বলেছিল, “ফিবান। পি এইচ আই বি এ এন।“

“ফিবান?”

“না, ফিবান।”

আমি একটু ধন্দে পড়ে গেলাম। আরও কয়েকবার ওর কাছ থেকে শুনে বুঝলাম, ‘ফি’ উচ্চারণ করার সময় মুখ দিয়ে বেশি হাওয়া ছাড়লে হবে না। শ্বাসটা মুখের মধ্যেই ধরে রেখে উচ্চারণ করতে হবে। ফি-বান। ফিবান। কয়েকবার বলা অভ্যাস করার পর দেখলাম ফিবান বেশ সন্তুষ্ট হল আমার উচ্চারণে। আমারও ভাল লাগল বেশ। চলতে থাকলাম আমরা। জঙ্গলের ভেতর থেকে নানা রকম পাখি পোকামাকড়ের ডাক ভেসে আসছে। পথ খুব সুগম না হওয়ায় টুরিস্টের আনাগোনা এদিকে কম, বিশেষত বয়স্ক মানুষদের।

হাঁটছি তো হাঁটছি। ফিবান প্রজাপতির মতো উড়তে উড়তে চলছে। আমরা চলছে ব্যাঙের মতো থপথপ করে। ফিবান মাঝে মাঝে দাঁড়িয়ে পড়ছে আমাদের জন্য।

ভেবেছিলাম এক ঘণ্টার মধ্যেই পৌঁছে যাব। কিন্তু নংরিয়েত গ্রামে যখন পৌঁছলাম, তখন প্রায় একটা বাজে। অর্থাৎ, প্রায় আড়াই ঘণ্টা সময় লাগল।

তবে দেখার মতো জায়গা বটে। রবার গাছে শিকড় জুড়ে জুড়ে জোড়া রুট ব্রিজ করা। সম্ভবত, গ্রামের মানুষরাই এটা বানিয়েছেন। একটার ওপরে আর একটা। নীচে একটা ছোট পাথুরে জলাশয়। বড় বড় পাথরের ওপর থেকে জল চুঁইয়ে নীচে পড়ছে। জল যদিও খুব বেশি নেই সেখানে। বেশ কয়েকজন টুরিস্ট এখানে ছিলেন। গ্রামের মধ্যেও আছে টুরিস্টদের থাকার ব্যবস্থা। অনেকেই সেখানে রাত্রিবাস করেন। অনেকটা হাঁটার পর এখানে এসে খুব ভাল লাগছিল। পাথরের ওপর অনেকক্ষণ বসে বিশ্রাম নিলাম।

ওখান থেকে এক ঘণ্টার দূরত্বে আছে একটা ঝর্ণা। রেইনবো ফলস। ফিবানকে রাজি করিয়ে আমরা আবার রওনা দিলাম সেখানে। কিন্তু তখনও বুঝিনি ওটাই আমাদের কাল হতে চলেছে।

স্থানীয় মানুষদের কাছে শুনলাম, রেইনবো ফলস নামটা হয়েছে সূর্যের আলোর সাথে সম্পর্কের কারণে। ঝর্ণার জলে সূর্যের আলো পড়ে রামধনু রং বিচ্ছুরিত হয়। তাই আমাদের আড়াইতে তিনটের মধ্যেই সেখানে পৌঁছাতে হবে। রুট ব্রিজ থেকে যখন বেরলাম তখন দুপুর প্রায় দেড়টা বাজে। সবাই বলল এক ঘণ্টার হাঁটা পথ। এখানে আসার আগেও এক ঘণ্টার হাঁটা পথ আমাদের লেগেছে দু’ঘণ্টারও বেশি সময়। এবার তাহলে কী হবে কে জানে! তবুও যাওয়ার লোভ সামলাতে পারলাম না। যা থাকে কপালে। বেরিয়ে পড়লাম ফিবানকে অনুসরণ করে।

রুট ব্রিজে আসার সময় আমরা পাহাড় থেকে নেমেছি। এবার রেইনবো ফলস দেখার জন্য আবার পাহাড়ে চড়তে শুরু করলাম, কিন্তু উল্টোদিকের পাহাড়। অর্থাৎ আমাদের গাড়ি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, তার থেকে আমরা আরও দূরে সরে যাচ্ছি রামধনু ঝর্ণা দেখার জন্য।

বেশ কিছুটা যাওয়ার পরেই বুঝলাম এই পথ আরও খাড়াই এবং হাঁটা বেশি কষ্টসাধ্য। থেমে থেমে এগোতে লাগলাম। ঘড়িতে দুটো বেজে গেছে। সেই কোন সকালে খেয়েছি। পেটে কিচ্ছু নেই। সাথে থাকা জলও ফুরিয়েছে। জনশূন্য চারদিক। ফিবান বলল যে রেইনবো ফলসের পাশে একটা দোকান আছে। হাঁটছি তো হাঁটছি।

“ফিবান আর কতদূর?”

“পনেরো মিনিট।”

হাঁটছি আর ভাবছি, এই পথ আবার ফিরতে হবে। অনেকেই রেইনবো ফলস দেখে ফিরছেন। তাঁরা বললেন, তাড়াতাড়ি যেতে হবে। সূর্যের আলো কমে আসছে।

রেইনবো ঝর্ণাতে যাওয়ার পথেই পড়ে ‘ব্লু লেগুন’। নীল জলের কুণ্ড। সম্ভবত সামনের ওই ঝর্ণার জলই এখানে জমা হয়ে এই নীল জলের কুণ্ড সৃষ্টি করেছে। খুব সুন্দর জায়গা। অনেকেই স্নান করছেন সেখানে। এখানে বেশিক্ষণ দাঁড়ালাম না। এগারো নম্বর গাড়িতে করে আবার হাঁটা শুরু করলাম।

যখন পৌঁছলাম, তখন তিনটে বেজে গেছে। প্রখর ভাবে সরাসরি আর সূর্যের আলো পড়ছে না ঝর্ণার ওপরে। ফলে রামধনু রঙের বিচ্ছুরণ আর আমাদের দেখা হল না। তবুও ঝর্ণাধারাটা ভাল লাগল। অনেকটা উঁচু থেকে পড়ছে জল। নিজে তৈরি হয়েছে নীল জলকুণ্ড। এদিকে সব জলই দেখছি একদম নীল। কোনও বিশেষ মিনারেল কম্পোজিশনের কারণে জলের এই রং হতে পারে।

পা টনটন করছে। শরীরে ক্লান্তি। তবুও মেঘালয়ের এই রূপকে মায়াবী লাগল। অপরূপ মেঘালয়। অনন্য মেঘালয়।

ফিবানকে দেখে মনেই হল না যে তার কোনও ক্লান্তিবোধ আছে। সে তখনও প্রজাপ্রতির মতো উড়ছে। আর আমরা ব্যাং থেকে হয়ে গেছি কচ্ছপ, বা তার চেয়েও ধীরগতিসম্পন্ন।

ঝর্ণার পাশেই আছে একটা দোকান। শুধু কোল্ডড্রিঙ্কস। জল ফুরিয়ে গেছে। আর আছে আনারস। এদিকে আনারস আর পেঁপে খুব দেখা যায়। খালিপেটে আনারস খেলাম। আর তিনগুন দামে কিনলাম এনার্জি ড্রিঙ্ক।

বেশিক্ষণ বসা গেল না। মেঘালয়ে ভোর যেমন তাড়াতাড়ি হয়, সন্ধ্যেও নামে তাড়াতাড়ি। সাড়ে তিনটে নাগাদ আবার ফেরার পথ ধরলাম। রুট ব্রিজ পর্যন্ত প্রথমে নামব, তারপর আবার উঠবো।

চলছি তো চলছি। পথ আর ফুরোয় না। রুট ব্রিজ পর্যন্ত অপেক্ষাকৃত তাড়াতাড়ি যেতে পারলাম, কারণ তখন নামছি। এবার বাকি পথটা উঠতে আবার হবে। চারিদিকে ঝুপ করে সন্ধ্যে নামল। যারা রুট ব্রিজের কাছে ছিলেন তখনও, তাঁরা ওই গ্রামেই আজ রাতটা কাটাবেন। পথের ক্লান্তি ভুলতে গল্প করছি ফিবানের সাতে। ওর প্রিয় বিষয়, অবসরে কী করতে ভালোবাসে, বাড়িতে কে কে আছে, বড় হয়ে কী হতে চায় ইত্যাদি।

ফিবান বড় হয়ে ডাক্তার হতে চায়। কিন্তু যদি না হতে পারে, তাহলে গাইড হবে। পাহাড়ের পথে পথে ঘুরে বেড়াতে তার খুব ভাল লাগে।

অন্ধকার হয়ে এসেছে। ফিবানের সাথে কথা বলতে বলতে হাঁটছি। ফিবান মাঝে মাঝে গুনগুন করে নিজস্ব ভাষায় সুর ভাঁজছে। খাসিয়া উপজাতির মানুষেরা খুব গান প্রিয় হয়।

আমরা হাঁটছি তো হাঁটছি। চারিদিকে জঙ্গল। জনমানবের চিহ্ন মাত্র নেই। রাতচরা পাখির ডাক কানে আসছে। অন্ধকারে মাঝে মাঝে ফিবান এগিয়ে গেলে, ভয়ে ভয়ে ডাকছি, “ফিবান… ফিবান…”

ফিবান উত্তর দিয়ে বলছে, “ভয় নেই, আমি আছি।”

ফিবান আমার আমার নাম, বাড়ির ইত্যাদির খোঁজখবর নিচ্ছে, আমি কি করি না করি জিজ্ঞাসা করছে।

আমার হাঁটার গতি খুব ধীর হয়ে যাচ্ছে। মনে মনে ঠিক করে নিয়েছি যে, কুড়ি ধাপ উঠে আধ মিনিট বিশ্রাম নেব। দুই হাঁটু টনটন করছে। কাছে এক ফোঁটা জল নেই। অনেকটা হাঁটার পর এক জায়গায় দেখলাম পাহাড়ের গা বেয়ে টুপটুপ করে জল পড়ছে। আমি আর থাকতে পারলাম না। জিজ্ঞাসা করলাম, “ফিবান, দাঁড়াও একটু। এই জল আমি খাব। আর পারছি না।”

টুপটুপ করে সেই ফোঁটা ফোঁটা জলের নীচে মুখ পেতে দাঁড়ালাম। এ যদি অমৃত না হয়, তাহলে পৃথিবীর আর কোথাও অমৃতের সন্ধান করে লাভ নেই। আমার পরে ফিবানও দেখলাম সেই অমৃত পান করল।

তারপর আবার হাঁটা। পথের যেন শেষ নেই। জঙ্গলের মধ্যে থেকে অচেনা-অজানা বিভিন্ন শব্দে চমকে উঠছি। জঙ্গলেরও যেন আলাদা ভাষা আছে। আমি ভিনদেশি। ফিবানের স্বভাবসিদ্ধ অকুতোভয় ভঙ্গি। বারবার ফিবানকে জিজ্ঞাসা করছি, “ফিবান আর কতদূর? ফিবান আর কতদূর?”

ফিবান অনেক উঁচুতে একটা আলো দেখিয়ে বলছে, “ওই যে, ওই আলোর কাছে আমাদের যেতে হবে।”

যদিও অনেকদূর, তবুও আলো আছে। আবার চলা শুরু করলাম। একসময় বললাম, “আমি যদি এখানে মরে যাই তাহলে কী হবে ফিবান?”

ফিবান উত্তর না দিয়ে খিলখিল করে হেসে উঠল। বলল, “তুমি মরবে না, আমি আছি তো।”

মনে হল ফিবান যেন আমার কতকালের চেনা, আমার কত আপন। কখনও কি ভেবেছিলাম, মেঘালয়ের পূর্ব খাসি হিলস জেলার এক পাহাড়ি মেয়ে ফিবানের সাথে পুরো একটা দিন গল্প করতে করতে পাহাড়ের গা বেয়ে ওঠা নামা করব!

আকাশে গোল চাঁদ। রুপোলী জ্যোৎস্না গাছের ফাঁক দিয়ে এসে পড়ছে পাথুরে পথের ওপর। সীমান্ত লাগোয়া বাংলার কোন এক অখ্যাত গাঁয়ের ছেলে প্রায় হাজার মাইল দূরে জ্যোৎস্না রাতে পাহাড়ি পথে হেঁটে চলেছে সারা দিন ধরে। সে হাঁটছে তো হাঁটছে। হাঁটছে তো হাঁটছে। এ যাত্রা যেন অনন্তের পথে যাত্রা। এর যেন কোনও শেষ নেই।

তবুও শেষ সবকিছুরই থাকে। পথও শেষ হল অবশেষে। ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে সাতটা বাজে। ওপরে লোকজনের আওয়াজ পেয়ে মনে হল জীবনে এর চেয়ে আনন্দ আর যেন কখনও পাইনি। দুই হাঁটু ব্যাথা। এই শীতের রাতেও ঘেমে নেয়ে একশা। সারাদিন পেটে কিছু পড়েনি। ওপরে উঠেই প্রথমে জড়িয়ে ধরলাম ফিবানকে। মনে হল যেন ওর জন্যই আজ হেঁটে এতটা পথ আসতে পেরেছি। তারপর শুয়ে পড়লাম পাথুরে মাটিতে। ড্রাইভার দাদা ছুটে এলেন। আশেপাশে শুধু আমরা আর জনা কয়েক স্থানীয় মানুষ।

বেশ কিছুক্ষণ শুয়ে-বসে থাকার পর যেন একটু ধাতস্ত হলাম। ঠাণ্ডাটা যেন গায়ে লাগল তখন। একটু দূরেই জ্বলছিল একটা আগুনের কুণ্ড। একটি বাচ্চা ছেলে আগুন পোহাচ্ছিল। সরল মায়ামাখা ভঙ্গিতে ভাঙা ভাঙা ইংরেজিতে সে ডাকল, “এখানে এসো। আগুনের ধারে বস। ভাল লাগবে।”

পরম আত্মীয়ের মতো এই আহ্বানটুকুর জন্য সে আমার প্রাণের কোন গভীরে চিরতরের জন্য স্থান লাভ করল, তা শুধু আমিই জানি। উঠে গেলাম তার পাশে।

ওর নাম সিমাইয়স। সে ক্লাস ফোরে পড়ে। বড় হয়ে ভারতীয় সেনায় যোগ দিতে চায়। ওইটুকু সময়ে কত কথা যে হল! এইটুকু সময়েই কত আপন যে তাকে মনে হল!

তাকে বললাম যে, “তোমার কথা, ফিবানের কথা, এখানকার মানুষের কথা আমি বাড়িতে গিয়ে বলব।” সে আনন্দমাখা দৃষ্টিতে অবাক বিস্ময়ে চেয়ে রইল আমার দিকে। তারপর জিজ্ঞাসা করল, “কে কে আছে তোমার বাড়িতে?”

আমি বললাম, “মেই, পা। এছাড়াও আমার হেনমেন নেনকং ও আছে। বিয়ে হয়ে গেছে যদিও।”

আমার কথা শুনে যে মুক্তখছিত দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকাল, সেই দৃষ্টি আমি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত মনে রাখব। ‘মেই’ মানে মা। ‘পা’ মানে বাবা। আর ‘হেনমেন নেনকং’ মানে দিদি। ফিবানের কাছ থেকে সারাদিনে খাসিয়া ভাষার বেশ কিছু কথা শিখেছিলাম। সিমাইয়স কল্পনাও করতে পারেনি বাইরে থেকে কেউ এসে তার সাথে খাসিয়া ভাষার কিছু শব্দ প্রয়োগ করে কথা বলবে। স্বীকার করতে বাধা নেই, তার সেই অনন্য উদ্ভাসিত মূর্তিখানি আমার জীবনের পরম প্রাপ্তি।

কথায় কথায় রাত বেড়ে চলল। ড্রাইভার দাদা ওদিকে তাড়া দিচ্ছিলেন। যেতে হবে অনেকটা পথ। আজ যদিও শিলঙে ফিরব না। থাকব চেরাপুঞ্জিতে। তবুও সে রাস্তাও বড় কম নয়।

সবাইকে হাতজোড় করে প্রণাম জানিয়ে বললাম, “খুবলেই। খুবলেই শিবান।” অর্থাৎ, অশেষ ধন্যবাদ।

গাড়ি ছুটে চলল সোহরা বা চেরাপুঞ্জির দিকে। পেছনে পড়ে রইল খাসি পাহাড়ে অবস্থিত নংরিয়েত আর মওলাখিয়েত গ্রাম। পড়ে রইল ফিবান আর সিমাইয়সের সরল মায়ামাখা মুখ আর হাস্যজ্জ্বল খাসিয়া মানুষের দল।

মসৃণ রাস্তা দিয়ে গাড়ি এগোচ্ছে। সারাদিনের পথশ্রমে আমার শরীর ক্লান্ত শ্রান্ত অবসন্ন। অথচ মন কানায় কানায় পূর্ণ। মনের এই পূর্ণতা যেন কোন এক জাদুবলে ভুলিয়ে দিয়েছে সমস্ত শারীরিক ক্লান্তি। অদৃশ্য এক জাদুকাঠির ছোঁওয়ায় সব ক্লান্তি যেন এক রাশ সুগন্ধি পাহাড়ি ফুল হয়ে রুপোলী জ্যোৎস্নার মতো ঝরে পড়ছে আমার ওপরে। (ক্রমশ..)

অন্তিম পর্বের লিঙ্ক: https://www.mrkhajuraho.com/post/6a84820ed56b49328840c8bd ↗

✦ ──── ❦ ──── ✦
Visual Chronicles

Photographic Plates from the Field

Plate 2
PLATE 2 • FIELD EVIDENCE
Plate 3
PLATE 3 • FIELD EVIDENCE
Plate 4
PLATE 4 • FIELD EVIDENCE
Plate 5
PLATE 5 • FIELD EVIDENCE
Plate 6
PLATE 6 • FIELD EVIDENCE
Plate 7
PLATE 7 • FIELD EVIDENCE
Plate 8
PLATE 8 • FIELD EVIDENCE
Plate 9
PLATE 9 • FIELD EVIDENCE
Plate 10
PLATE 10 • FIELD EVIDENCE
Plate 11
PLATE 11 • FIELD EVIDENCE
Plate 12
PLATE 12 • FIELD EVIDENCE
Plate 13
PLATE 13 • FIELD EVIDENCE
DISPATCH WIRE:
Next Expeditions

Continue the Cultural Journey

✉ Correspondence Archive

Curator's Postbox

📬3 Letters on file
PEN YOUR LETTERYour thoughts become part of the permanent record
#01
রেজওয়ানা পারভীন
Aug 16, 2026

উফ! সারাদিনের শেষে অফিস থেকে ফিইর্য়া পড়তাসি। খুব ভালো লাগসে। পরের পর্ব কবে পাইবো ভাইয়া?

AuthorAug 17, 2026

@রেজওয়ানা পারভীন ধন্যবাদ আপু। আপনার ভাল লাগছে জেনে আনন্দিত হলাম। পরের পর্ব আসবে খুব শীঘ্রই...

#02
R
Robert O' Neil
Aug 16, 2026

Hey man. I've just opened this link and saw this. My little daughter told me to copy it and translate through gpt. After doing it I went through this travelog and ot is wonderful. Keep it up mate. My maid said this is Bengali language. Are you from Bangladesh? @author

AuthorAug 17, 2026

@Robert O' Neil Thank you so much Robert. Your appreciation is such a pleasure for me. Yes, as your maid said, the original language is indeed Bengali which is my mother tongue. And I am from West Bengal, a state of India. I am also sending my warm gratitude to your little daughter for whom you have been abled to go through this travelogue.

#03
বীথি ইসলাম
Aug 17, 2026

ফুপা, শ্যাষের ছবিটায় আপনে কোনটা? লাঠি হাতে দাঁড়ানো গম্ভীর বুড়াটা নাকি চশমা চোখে উকি দেওয়া ফাজিল লোকটা?🤭🤭 একটু মজা করতাসিলাম, খারাপ পাইলেন নাকি? ফুপিরে বলুমনে, আপ্নের মন ভালো কইরা দেবো নে। পরের পর্ব জলদি দিয়েন।।❤️❤️❤️

AdminAug 17, 2026

@বীথি ইসলাম আপনি কিন্তু লেখককে বেশ বিড়ম্বনাতে ফেললেন..😂

AuthorAug 18, 2026

@বীথি ইসলাম গেস করুন তো কোনটা আমি হতে পারি... 🤪

বীথি ইসলামAug 18, 2026

@author পিছনের টুপি পড়া লোকটা আপনে।😌😌😌

AuthorAug 18, 2026

@বীথি ইসলাম নাহ্! পারলেন না। আপনাকে প্রথমে বুদ্ধিমান ভেবেছিলাম। কিন্তু বাস্তব দেখছি অন্যরকম... 🤪🤪

বীথি ইসলামAug 19, 2026

@author ভুল কইলাম নাকি?তাইলে আপনে কোনটা?🥺

✦ END OF CORRESPONDENCE LEDGER — 3 LETTERS ON RECORD ✦
0%
READ
3