Mr.Khajuraho - Curated Global Insights. Stories That Matter.
Return to Archives
✦ ARCHIVE DISPATCH № KH-C8BDREADING TIME: 17 MIN
#Cultural#সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রেক্ষাপট

মেঘমুলুকের আবছায়াতে (অন্তিম পর্ব)

Aug 18, 2026Chronicled by অর্ণব মণ্ডল 430 Reader Explorations
মেঘমুলুকের আবছায়াতে (অন্তিম পর্ব)
ARCHIVAL FIELD PLATE I — মেঘমুলুকের আবছায়াতে (অন্তিম পর্ব)AUTHENTICATED RECORD
REFERENCE WIRE: দ্বিতীয় পর্বের লিঙ্কhttps://www.mrkhajuraho.com/post/6a80a4a77a18dbd6830a3913
Inspect Link ↗

রদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই টের পেলাম দুই পায়ের থাই মাসল আর কাফ মাসলে প্রচণ্ড ব্যথা। সাথে ব্যথা হাঁটুতেও। হাঁটতে বেশ কষ্ট হচ্ছে। আগেরদিন রাতেই ফেরার সময় ভলিনি স্প্রে কিনেছিলাম। সেটা যে খুব বেশি কার্যকর হয়নি বুঝতে পারলাম। আমার বাকি দুই সঙ্গীর অবস্থা আমার চেয়েও খারাপ। বেরোবো কীভাবে কে জানে!

যাই হোক, অবশেষে যখন বেরোলাম, তখন ঘড়ির কাঁটা নটার ঘর ছুঁয়েছে। আজ খুব বেশি হাঁটাহাঁটির বালাই নেই। ঠিক হল, যেগুলো সম্ভব হবে সেগুলোই দেখব। আজ যে যে জায়গায় যাওয়ার কথা সেগুলো চেরাপুঞ্জির মধ্যেই, এবং হোটেল থেকে খুব বেশি দূরেও নয়। তবে আমাদের আজ শিলং ফিরতে হবে। এখানকার পালা আজকেই সাঙ্গ হবে।

প্রথমে গেলাম নোহকালিখাই ফলস দেখতে। ভারতের তৃতীয় উচ্চতম জলপ্রপাত। উচ্চতা ৩৪০ মিটার। ওপর থেকে ট্রেক করে নীচে ঝর্ণার একদম কাছে যাওয়া যায়। কিন্তু আজ ট্রেকিং-এর কথা ভাবলেই যেন হাঁটু টনটন করে উঠছে। তাই ওপর থেকেই দেখছি। জায়গাটা অপূর্ব। চারিদিকে সবুজ পাহাড় গা ঘষাঘষি করে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে। ফাঁকা জায়গায় হাওয়া দিচ্ছে শনশন করে। মাথার ওপরে পরিষ্কার আকাশ। সূর্যদেবের করুণা ঝরে পড়ছে সকলের ওপরে। মেঘালয় তার মায়াবী রূপ নিয়ে ধরা দিয়েছে আমাদের কাছে। তবে শীতকাল বলেই হয়তো জলের ধারাটি তেমন পুষ্ট নয়। এখানেও নীচে যে জলের কুণ্ড তৈরি হয়েছে, তার জল নীল। একটা রেখার মতো সরু নদীর ধারা বয়ে অদৃশ্য হয়ে গেছে নীচের গাছপালা থেকে। ওপর থেকে নীচের দিকে তাকালে আন্দাজ পাওয়া যায় যে কেন এটি ভারতের উঁচু জলপ্রপাতগুলোর মধ্যে অন্যতম। এই জলপ্রপাতের একটা বৈশিষ্ট্য হল, এর জলধারা পাহাড়ের ওপর থেকে মাঝে অন্য কোনও পাথরের ওপর না পড়ে সোজা নীচে পড়ে। ফলে জলের শক্তিও অনেক বেশি হয়। বলা বাহুল্য, বর্ষাকালেই এর রূপ সঠিকভাবে ধরা দেয়। তবুও প্রকৃতি মায়ের রূপ ঋতুভেদে আমরা যতটুকু দেখলাম, তাই বা কম কী!

গাড়ি আবার চলা শুরু করল। এবারের গন্তব্য নোহগিথিয়াং ফলস। এটি অবশ্য ‘সেভেন সিস্টারস ফলস’ নামেই বেশি পরিচিত। সাতটি ধারা থেকে জলপ্রপাতটির এমন নামকরণ। এর আর একটি নামও আছে। মাওসমাই ফলস। নিকটবর্তী মাওসমাই গ্রামের নাম থেকে এই নাম।

খুব হতাশ হলাম। আমার উল্টোদিকের পাহাড় থেকেই নেমেছে বিখ্যাত জলপ্রপাত, কিন্তু এখন একফোঁটা জল নেই তাতে। শুকনো খটখট করছে। পাহাড়ের গায়ে অনেকগুলো চওড়া জলধারা দেখা যাচ্ছে। জলহীন সেই ধারাগুলোতে হলুদ রোদ চকচক করছে। বর্ষাকালে এর রূপও আন্দাজ করতে পারছি। কিন্তু এখন! এক্কেবারে জলশূন্য। বাকি জায়গাগুলো সবুজ। চারপাশে গায়ে গা ঠেকিয়ে নিশ্চিন্তে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়ের সারি। পাহাড়ি উপত্যকা। রূপসী মেঘালয়। কিন্তু জলপ্রপাতের সামনে দাঁড়িয়ে যখন দেখি একফোঁটা জল নেই, তখন কিঞ্চিত মনখারাপ হয় বৈকি। বিশেষ করে সেটা যদি বিখ্যাত সেভেন সিস্টারস ফলস হয়। প্রকৃতি মায়ের এও এক রূপ। সে চলবে তার মতো। মাথা নিচু করে তার আনুগত্য মেনে নেওয়া ছাড়া আমার কোনও কাজ নেই।

দেখতে এসেছিলাম উন্মত্ত ঝর্ণা, দেখলাম তার অন্য রূপ। কিন্তু ভেবে দেখলাম, এও তো জীবনেরই শিক্ষা। যা চাই, তা কি মেলে সবসময়? যতটুকু পেয়েছি, তার মধ্যেই আনন্দ খুঁজে পাওয়ার চেষ্টাই তো করেছি জীবনে। তাহলে আর মনখারাপ কেন। মেঘালয়ের এই পাহাড়ি গাম্ভীর্যের যে মাদকতা, তার কাছে কি আমার কম ঋণ!

আবার গাড়ির মুখ ঘুরল। এবার গন্তব্য মাওসমাই কেভ। এখান থেকে খুব বেশি দূরে নয়। পায়ের ব্যথাটা বেশ জানান দিচ্ছে। হাঁটুতে হাত বোলাচ্ছি আর মনে মনে ভাবছি, গুহার ভেতরে ঢুকতে পারব তো? ড্রাইভার দাদা আশ্বস্ত করছেন। এখানে ঢুকতে তেমন অসুবিধা হবে না। এই কথা শুনে মনে বল পাচ্ছি। পায়ে ব্যথার কথা মনে হলেই মনে পড়ে যাচ্ছে ফিবানের কথা। মাথায় যেন সবসময় ফিবানকে নিয়েই ঘুরছি। বারবার মনে করছি, কাল এই সময় কী করছিলাম, কোথায় ছিলাম। ভাবতে ভাবতে মাওসমাই গুহা চলে এল। পার্কিয়ের সামনেই বড় বড় করে ইংরেজিতে লেখা, Mawsmai Cave। মাওসমাই শব্দটি আসলে দুটি খাসি শব্দের সমষ্টি। ‘Maw’ এবং ‘Smai’। একত্রে যাদের অর্থ দাঁড়ায় ‘Oath Stone’ বা শপথ পাথর। শোনা যায়, এখানে অবস্থিত কোনও এক পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে খাসিয়া মানুষরা ঐক্যবদ্ধ থাকার শপথ নিয়েছিল।

মেঘালয়ে অনেক গুহা আছে। খাসি গারো জয়ন্তিয়া পাহাড়ে প্রাকৃতিকভাবে তৈরি অনেক গুহা রয়েছে। এমনকি ভারতের দশটা দীর্ঘতম গুহার মধ্যে প্রথম ন’টাই মেঘালয়ে অবস্থিত। মাওসমাই গুহা যদিও খুব দীর্ঘ নয়।

হাঁটুর ব্যাথা সামলে আমরা ধীরে ধীরে হেঁটে গেলাম সামনের দিকে। টিকিট কেটে ঢুকতে হবে। মাথাপিছু পঞ্চাশ টাকা করে টিকিট। সিঁড়ি দিয়ে বেশ কিছুটা ওঠা নামা করতে হয়। আবার সিঁড়ি! এই হাঁটু নিয়ে আবার সিঁড়ি ভাঙতে পারব তো?

একজনকে জিজ্ঞাসা করে জানলাম সিঁড়ি খুব বেশি নেই। একটু আশ্বস্ত হয়ে গুহার উদ্দেশ্যে এগোলাম। হাঁটুতে বেশ ভাল চাপ পড়ছে বুঝতে পারছি। রেলিং ধরে ধরে এগচ্ছি। চারপাশে প্রচুর গাছপালা। পাখির ডাক। গাছে গাছে বড় বড় কাঠবেড়ালি। ওগুলো যে কাঠবেড়ালি প্রথমটায় বুঝতেই পারিনি।

সামনেই গুহামুখ। ঢুকলাম। ভেতরে অন্ধকারাচ্ছন্ন। তবে মাঝে মাঝে আলোর ব্যবস্থা আছে। স্ট্যালাকটাইট আর স্ট্যালাকমাইট পাথরের দেওয়াল। প্রাকৃতিক ভাবে কতরকমের যে কারুকার্য হয়ে রয়েছে দেওয়ালে। উঁচুনিচু এবড়োখেবড়ো, কিন্তু অপরূপ। দেওয়াল কোথাও কোথাও ভিজে স্যাঁতসেঁতে। গা বেয়ে জল চুঁইয়ে পড়ছে। ভেতরটা ধীরে ধীরে সংকীর্ণ হয়ে এসেছে। গুড়ি মেরে ভেতরে ঢুকতে হচ্ছে। মাথা বাঁচিয়ে এগোতে হচ্ছে সাবধানে। একটু অসাবধান হলেই শক্ত পাথরের দেওয়ালে মাথা ঠুকে যেতে পারে। তবে পথ দীর্ঘ নয়। আলোর দেখা মিলল অচিরেই। গুহার ওপর দিয়ে প্রবেশ করেছে দিনের আলো। সামনেই বেরোনোর পথ। বেরিয়ে পড়লাম। একটু এগিয়ে দেখলাম সামনে আরও একটা গুহা। তবে ভেঙে গিয়েছে সামনের দিকটা। পথ আরও সংকীর্ণ হয়ে গেছে। এক কালে হয়তো ঢোকা যেত। কিন্তু এখন পরিত্যক্ত অবস্থাতেই পড়ে রয়েছে। ভেতরে সাপখোপ থাকাটাও অসম্ভব নয়। যদিও সময়টা শীতকাল। তবুও আর এগলাম না।

তবে জায়গাটা খুব সুন্দর। চারিদিকে প্রচুর গাছপালা। কতক্ষণ যে বসে ছিলাম, জানি না। কিন্তু এবার যে বেরোতে হবে এখান থেকে। সিঁড়ি দিয়ে নামতে সুরু করলাম। পায়ের ব্যাথাটা থেকে থেকেই নিজের অস্তিত্ব বুঝিয়ে দিচ্ছে। তবুও চলতে তো হবেই।

এরপর আমাদের যাওয়ার কথা ছিল ‘আরয়া কেভ’ দেখতে। কিন্তু সেখানে ঢোকার পথ অতি দুর্গম এবং আমাদের সবার পায়ের অবস্থা অত্যন্ত খারাপ হওয়ার কারণে আমরা যেতে পারলাম না সেখানে। আরয়া কেভের সামনে দিয়েই গাড়ি ছুটিয়ে দিলেন ড্রাইভার দাদা। এরপর একই কারণে বাদ গেল ‘গার্ডেন অফ কেভস’ও। এক জায়গায় অনেকগুলো গুহা। গুহার বাগান। আমাদের অবস্থা এখন এমন যে ঘুরতে এসে বিছানায় শুয়ে থাকতে পারলেই ভাল হতো। শরীরের অবস্থা বুঝেই চলতে হবে। কিছু করার নেই। পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে চলাই মানব ধর্ম। তাই গাড়িতে বসেই উপভোগ করছি মেঘালয়ের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চলার পথে কোনও জায়গা খুব ভাল লাগলে দাঁড়িয়ে পড়ছি। একটু নেমে কিছুক্ষণ সময় কাটিয়ে আবার পথ চলা।

সারাদিনটা মোটামুটি এভাবেই কাটল। সেদিন আমাদের শিলঙে ফেরার কথা ছিল। চেরাপুঞ্জিতে ওটাই ছিল শেষ দিন। সন্ধ্যের মধ্যেই আমরা ফিরে এলাম শিলঙে। রাতের শিলং সেজে উঠেছে রঙ – বেরঙের আলোয়। সামনেই বড়দিন। উৎসবের মেজাজে সবাই। কিন্তু আমাদের দরকার বিশ্রাম। রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে স্থানীয় আয়ুর্বেদিক জড়িবুটি দিয়ে বানানো তেল পায়ে ভাল করে মালিশ করে আর সাথে একটা পেইন কিলার খেয়ে শুয়ে পড়লাম। পরদিন অনেক কিছু দেখার আছে। এগারো নম্বর গাড়িকে চাঙ্গা করতেই হবে যতটা সম্ভব।

পরদিন সকালে উঠে অনেকটাই স্বস্তি বোধ করলাম। পায়ের ব্যথা অনেকটাই কম। আছে, তবে হাঁটতে খুব বেশি অসুবিধা হবে না। গতদিনের তুলনায় অনেক ভাল। হাসি ফুটল আমাদের তিনজনের মুখেই। নয়তো আজ দিনটায় কত কিছু দেখার যে আছে। বেশ উত্তেজিত লাগল নিজেকে। তাড়াতাড়ি স্নান সেরে জলখাবার খেয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

আমরা চলেছি ডাউকির দিকে। ডাউকি নদী। মেঘালয়ের অন্যতম সেরা আকর্ষণ বলে শুনেছি। আজ দেখব। অনেকটা রাস্তা যেতে হবে। পশ্চিম জয়ন্তিয়া হিলস জেলার অন্তর্গত এই জায়গাটি শিলং থেকে প্রায় একশ কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত। অর্থাৎ, আমরা পূর্ব খাসি হিলস জেলা থেকে যাচ্ছি পশ্চিম জয়ন্তিয়া হিলস জেলার দিকে। পাকদণ্ডী বেয়ে যত এগচ্ছি, লোকালয় কমে আসছে। দুই ধারে পাইন গাছের সারি। আর দূরে পাহাড়ের দল দাঁড়িয়ে আছে মাথা উঁচু করে। কিছুটা এগোতেই দেখলাম দুই পাশে গিরিখাতের মধ্যে সাদা মেঘ জমে আছে। রাস্তার ওপরেও চলে এসেছে মেঘ। আমরা চলেছি মেঘের মধ্যে দিয়ে। সে যেন এক স্বর্গীয় দৃশ্য।

অনেকটা পথ যাওয়ার পর থামলাম একটা জায়গায় চা খাওয়ার জন্য। হোটেল কাম রেস্তোরা। নাম কাভরি। অনেকটা জায়গা জুড়ে। চলার পথে প্রতিদিনই অনেক জায়গাতেই থেমেছি। কিন্তু আলাদা করে এই জায়গায় নাম বলছি তার কারণ এর চারপাশের অসাধারণ প্রাকৃতিক সৌন্দর্য। চারিদিক গায়ে গায়ে পাহাড় দিয়ে ঘেরা। পাহাড়ি গাম্ভীর্যে মুগ্ধ হতে হয়। ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থাকা যায় শুধু এই দৃশ্য উপভোগ করার জন্য। পাহাড়ের দিকে মুখ করে আছে বসার জায়গা। সাথে যদি এক কাপ চা থাকে, তাহলে তো কথাই নেই।

প্রথম দিন থেকেই একটা ব্যাপার খেয়াল করেছি। তারপরে অনুভব করলাম যে, গাড়িতে পাকদণ্ডী বেয়ে ওঠা নামার সময় মাঝে মাঝেই কানে তালা লেগে যাচ্ছে। কানের মধ্যে যেন ভোঁ ভোঁ করছে। যদিও প্রথমে অতটা বুঝতে পারিনি। পরে আমাদের সফর সঙ্গী ভিকিদার কাছে জিজ্ঞাসা করাতে, তিনি বললেন পাহাড়ি রাস্তায় এটা হয়। আবার নিজে থেকেই ঠিক হয়ে যায়। বুঝলাম, পাহাড়ে বায়ুচাপের তারতম্যের কারণেই এমন হচ্ছে। ভয়ের কিছু নেই।

চলার পথে অনেক জায়গাতেই দেখছি মেশিন দিয়ে পাহাড় কাটা হচ্ছে। লরিতে পাথর বোঝাই করে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। মেঘালয় সিমেন্ট উৎপাদনে দেশের মধ্যে প্রথম সারির রাজ্য। পাহাড় ভাঙা পাথর রপ্তানি হয় নিকটবর্তী প্রতিবেশী দেশ বাংলাদেশেও। চওড়া হচ্ছে রাস্তা। তৈরি হচ্ছে নতুন নতুন রিসর্ট। যেখানে সেখানে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে উঠছে টুরিস্টদের নতুন নতুন থাকার জায়গা। টুরিস্টদের মনোরঞ্জনের জন্য আবিষ্কার হচ্ছে নতুন নতুন ‘স্পট’। পর্যটন শিল্প এ রাজ্যের আয়ের প্রধান উৎস। তবুও, প্রকৃতিকে পরম আনন্দে ভাঙছি তো বটে, কিন্তু নিজেদের সীমাটা কি জানি আমরা? বুঝি কি যে, কতদূর এগোলে প্রকৃতির রোষানলে পড়তে পারি?

চা খেয়ে আবার চলা শুরু। চলছি তো চলছি। একশ কিলোমিটার কম পথ নয়। তারপর একসময় পৌঁছলাম। পর্যটকদের বেশ ভিড়। গাড়ি থেকে নেমে আমরা বোট ঠিক করে নিলাম। মোটামুটি একঘণ্টার জন্য। ডাউকি নদীতে বোটিং এখানকার প্রধান আকর্ষণ।

টিকিট কেটে বোট ভাড়া করে আমরা সিঁড়ি বেয়ে নদীর তীরে নেমে এলাম। পায়ের ব্যথা যে একেবারে নেই তা নয়। সিঁড়ি দিয়ে নামার সময় ব্যথা টের পেলাম।

সরু নদী। নদীর ওপারে বাংলাদেশের সিলেট জেলা। নদীটাই এখানে সীমানা। এই নদী আবার জাফলং নাম নিয়ে প্রবেশ করেছে বাংলাদেশে। স্থানীয় ভাষায় ডাউকি নদীর নাম Umngot। ওপারে ভিড় করেছেন ওপার বাংলার বহু মানুষ। আমরা বোটে চড়লাম। একটা নৌকায় মাঝি বাদে তিনজন উঠতে পারে। সবাই উঠলে মাঝিভাই হাল বাইতে শুরু করলেন। কেন এটা ভারতের অন্যতম পরিষ্কার নদী এবার বুঝলাম। নদীর জল ঘন নীল আর একদম কাঁচের মতো স্বচ্ছ। নদীর তলদেশের নুড়িপাথর অবধি পরিষ্কার দেখা যাচ্ছে। যদিও বর্ষাকালে এই নদীর জল থাকে ঘোলা। শীতকালই ডাউকি নদীতে নৌকাবিহারের আদর্শ সময়।

নৌকা এগিয়ে যাচ্ছে সামনের দিকে। দুই পাশে পাহাড়ের উঁচু পার্শ্বদেশ। বর্ষাকালে নদীর জল আরও বেড়ে যায়। পাথরের উঁচু জায়গায় রয়েছে জলের দাগ। সামনে মাথার ওপরে একটা ব্রিজ। তার ওপর দিয়ে চলাচল করছে গাড়ি। আমরা নীচে জলের ওপর দিয়ে এগিয়ে চলেছি। কি যে অপরূপ সেই দৃশ্য। ঠাণ্ডা শীতল আবহাওয়ায় জলে ওপর ভেসে রয়েছি আমরা। জীবনে যেন কোনও চিন্তা নেই ভাবনা নেই। জীবন যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে আমার। সামনে বড় বড় নুড়ি পাথর বোল্ডার পড়ে একটু উঁচু হয়ে রয়েছে। ওপাশ থেকে জল একটু গতিতে সেই পাথরের ওপর দিয়ে এপাশে এসে পড়ছে। নৌকা আর ওদিকে যাবে না। ওপাশে নদী বেঁকে পাহাড়ের আড়ালে চলে গেছে।

আমরা ওখানে নামলাম। এটাকে স্থানীয় মানুষ ‘স্টোন আইল্যান্ড’ বলেন। এখানে আমরা মিনিট পনের কুড়ির জন্য দাঁড়াব। জুতো খুলে প্যান্ট গুটিয়ে নিলাম। তারপর গিয়ে বসলাম একটা বড় পাথরের ওপরে। পা ডুবিয়ে দিলাম নীল জলে। ঠাণ্ডা জলের ছোঁওয়ায় প্রাণ যেন জুড়িয়ে গেল। পাশ দিয়ে নদী বয়ে যাচ্ছে। একদম শান্ত জায়গা।

আবার তীরে ফেরা। মাঝিভাই নৌকা চালাচ্ছেন একদম ধার দিয়ে। পাশেই উঁচু পাহাড়ের ঢাল। ছায়াঘেরা মায়াময় পরিবেশ। মনে হচ্ছে যেন বিদেশি কোনও সিনেমা দেখছি।

তীরে এসে নামলাম আমরা। ডাউকি পর্ব মোটামুটি শেষ। ড্রাইভারদাদা বললেন, চলো, চট করে তোমাদের বর্ডারটা দেখিয়ে আনি।

আমরা চললাম ভারত বাংলাদেশ বর্ডার দেখতে। নদী থেকে যে ব্রিজটা দেখেছিলাম, সেই ব্রিজ পেরিয়েই চললাম আমরা। এদিকটা বেশ জনবহুল এলাকা। ট্রান্সপোর্টের বড় বড় লরি চলার কারণে, চারিদিকে খুব ধুলো। আমরাও ধুলো উড়িয়ে চললাম বর্ডারের দিকে। খুব বেশি সময় লাগল না। গাড়ি থেকে নেমে দাঁড়ালাম বর্ডারের সামনে। ওপারে সিলেট জেলা। কানে টুকটাক বাংলা কথা ভেসে আসছে বাংলাদেশ বর্ডার গার্ডের মুখ থেকে। বিদেশ বিভূঁইয়ে এসে বাংলা ভাষা শুনতে বেশ ভালই লাগছে। বাংলাদেশ শুনলেই মনে পড়ে, আমার ঠাকুরদাদারা সেই পঞ্চাশের দশকে চলে এসেছিলেন এপারে। বাবা তখন কত ছোট। বাবার জন্মও ওপারে। খুলনা জেলায়।

সেই কোন ছোটবেলায় পড়েছিলাম, “কোন দেশেতে তরুলতা/ সকল দেশের চাইতে শ্যামল/ কোন দেশেতে চলতে গেলেই/ দলতে হয় রে দূর্বা কোমল?/ কোথায় ফলে সোনার ফসল,/ সোনার কমল ফোটে রে?/ সে আমাদের বাংলাদেশ/ আমাদেরই বাংলা রে।”

দেশভাগ না হলে ওই দেশকেও আমার দেশ বলতে পারতাম। এখনও কি ভাবতে বাঁধা আছে! আমাদের মতোই তো মানুষ তারা। এক ভাষা, একই রকম পরিবেশ, গাছপালা। একই দোয়েল শ্যামা বুলবুলির দল সেখানেও ডানা মেলে উড়ে বেড়ায়। তবুও চাইলেই সেখানে যাওয়া যাবে না। এককালে যা আমারই দেশ ছিল, এখন সেখানে যেতে গেলে দরকার পাসপোর্ট, ভিসা। কিন্তু মনকে কেই বা কবে বাঁধতে পেরেছে? মনের তো পাসপোর্ট ভিসা লাগে না।

কিছুক্ষণ সেখানে কাটিয়ে বেরিয়ে পড়লাম। কাছেই একটা বাজার। স্থানীয় বাসিন্দাদের প্রায় সকলেই বাংলা বোঝেন, জানেন। খিদেতে পেট চুঁইচুঁই করছে। এর পর আমরা যাব মওলিনং গ্রামে আর সাথে দেখব আরও একটা লিভিং রুট ব্রিজ। দুপুরের খাওয়া সারব সেখানেই। এখনকার স্থানীয় বাজার থেকে হালকা টিফিন করে আবার চললাম। ডাউকি নদীর ওপরে সেই একই ব্রিজ দিয়ে আবার ফিরে এগিয়ে চললাম মওলিনং গ্রামের দিকে। আঁকাবাঁকা পথ। দুই পাশে ঘন জঙ্গল। আশেপাশেই সংরক্ষিত অরণ্য আছে। ঘন ঘন বাঁক। গাড়ির মধ্যে আমরা বারবার হেলে পড়ছি ডানদিক বাঁদিকে। দুপুর পেরিয়ে বেলা হেলে পড়েছে একদিকে। আমরা তখনও ছুটছি ছুটছি ছুটছি…

তারপর একসময় পৌঁছলাম রুট ব্রিজের কাছে। রিওয়াই গ্রামে। এটা আবার পূর্ব খাসি হিলস জেলার অন্তর্ভুক্ত। গাড়ি থেকে নেমে খাঁড়া সিঁড়ি বেয়ে অনেকটা নামতে হয়। যদিও চেরাপুঞ্জির নংরিয়েত গ্রামের ডবল ডেকার রুট ব্রিজে যাওয়ার মতো পথ অতো দুর্গম বা কষ্টসাধ্য নয়। আমরা ধীরে ধীরে নীচে নামলাম। মিনিট তিনেক সময় লাগল। সামনেই সেই ব্রিজ। রবার গাছের শিকড় জুড়ে তৈরি হয়েছে এই ব্রিজ। নীচের ছোট নদীটিতে জল জমে আছে অল্প। প্রবাহিত হওয়ার মতো জল নেই। হয়তো বর্ষাকালেই শুধু জল থাকে বেশি মাত্রায়।

এদিকে বেলা পড়ে আসছে। এখনও মওলিনং গ্রাম দেখা বাকি। এশিয়ার সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রাম। ইউনেস্কো হেরিটেজ সাইট। তার আগে সারতে হবে পেট পুজো। পেটের নাড়িভুঁড়িও যেন হজম হয়ে গেছে। শিকড়ের তৈরি ব্রিজ দেখে সিঁড়ি দিয়ে আবার উঠতে শুরু করলাম। বারবার ডবল ডেকার ব্রিজের কথা মনে পড়ছিল। আর মনে পড়ছিল ফিবানের কথা। ফিবান কী করছে এখন? আজও কি কোনও টুরিস্টের সাথে গেছিল পথ চেনাতে? সেদিনের মতো আগডুম বাগডুম কথা বলেছে তার সাথেও? তাঁকেও কি জিজ্ঞাসা করেছে, কে কে আছে তোমার বাড়িতে?

মওলিনং গ্রাম খুব দূরে নয়। পৌঁছতে মিনিট পনেরো সময় লাগল। যখন নামলাম গাড়ি থেকে তখন বেলা চারটে বেজে গেছে। গাড়ি থেকে নেমেই আগে ছুটলাম খাওয়ার জন্য। খেয়েদেয়ে এবার গ্রাম দেখতে বেরোলাম। গ্রামে প্রবেশের মুখেই লেখা আছে, Welcome to God’s own garden। ঈশ্বরের নিজের বাগানে স্বাগতম।

সুন্দর ছবির মতো সাজানো গ্রাম। ভেতরে আছে চার্চ, খেলার মাঠ, দোকানপাট। সবকিছুতেই যেন তুলির টান। প্রতিটি বাড়ির সামনেই রঙবেরঙের ফুলের বাগান। ক্রিস্টমাসের সময় বলেই হয়তো চার্চটি খুব সুন্দর ভাবে সাজানো ছিল। চার্চের কথা লিখতে গিয়ে মনে পড়ল ক’দিন আগে কাগজে পড়া এই চার্চে ঘটে যাওয়া একটি ঘটনার কথা। অভিযোগ, অক্ষর সাগর নামের এক তথাকথিত সমাজমাধ্যমের প্রভাবশালী ব্যক্তি এই চার্চে ঢুকে ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দিয়েছেন এবং এই ঘটনার ভিডিও করে তিনি সমাজমাধ্যমেও সেটি প্রকাশ করেছেন।

সারা দেশে যখন একটা চোরা সাম্প্রদায়িক হাওয়া বইছে, মেঘালয়ের গিয়ে মনেই হচ্ছিল না যে এখানে এমন কোনোরকম ঘটনা ঘটতে পারে। তবুও ঘটেছে। এখানকার শান্তিপ্রিয় খাসিয়া উপজাতির মানুষদের বেশীরভাগই খ্রিস্ট ধর্মের অনুরাগী। চার্চে গিয়ে জয় শ্রীরাম ধ্বনির মাধ্যমে জনৈক ব্যক্তি কী বোঝাতে চেয়েছেন তা তিনিই জানেন। আসলে এর মাধ্যমে নিজের ধর্মীয় চেতনাকেই তিনি অপমান করলেন।

হেঁটে হেঁটে গ্রামের মধ্যে অনেকটা পথ ঘুরলাম। গ্রামের ভেতরেই আছে চা কফি মোমো ইত্যাদি বিভিন্ন জলখাবারের দোকান। চা খেলাম আমরাও। দোকানী বয়স্ক ভদ্রমহিলার কাছ থেকে চায়ের কাপ হাতে নিয়ে বললাম, খুবলেই। মানে, ধন্যবাদ। আমার মতো বিদেশীর কাছে স্থানীয় খাসিয়া ভাষায় একটুকরো শব্দ শুনে ভদ্রমহিলার মুখে ফুটে উঠল মাধুরী মেশানো হাসি। জীবনে এর বেশি তো কিছু চাইনি আমি।

গ্রামের প্রায় প্রতিটি বাড়িতেই আছে টুরিস্টদের থাকার ব্যবস্থা। আমরা যদিও থাকব না এখানে। শিলং ফিরতে হবে আবার। তবে একটা দিন এখানে থাকলে কিন্তু মন্দ হতো না। এমন একটা গ্রামে সকালের নরম রোদ গায়ে মেখে ঘুরে বেড়াতে কিন্তু বেশ ভালই লাগবে।

ঝুপ করে চারিদিক অন্ধকার হয়ে এসেছে। রাস্তায় রাস্তায় জ্বলে উঠেছে আলো। আমাদের ফিরতে হবে এবার। আবার পাড়ি দিতে হবে প্রায় একশ কিলোমিটার পথ। ড্রাইভার দাদা গাড়ি স্টার্ট দিলেন। আঁকাবাঁকা পথ ধরে আমরা এগিয়ে চললাম শিলঙের দিকে। গাড়ির সিটে গা এলিয়ে দিয়ে বসলাম। চোখের সামনে ভেসে উঠছে মহাদেশের সবচেয়ে পরিষ্কার গ্রামের ছবি। আমরা কেন পারি না নিজেদের গ্রাম বা শহরকে পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন রাখতে? কেন আমরা নিজেরাই নিজেদের বসবাসের জায়গাগুলোকে ঢেকে দিয়েছি প্লাস্টিক এবং অন্যান্য নোংরা আবর্জনায়?

নিজেদেরকে সভ্য বলে বড়াই করতে লজ্জা করে না আমাদের?

আজ আমাদের ফেরার পালা। দুপুরে ট্রেন। কামাখ্যা থেকে। কিন্তু আমরা ভোরবেলা উঠে পড়েছি। আগেরদিন রাতে ঘুমোতে যাওয়ার আগেই ব্যাগ গুছিয়ে রেখেছিলাম। ভোর মানে খুব ভোর। ভোর চারটে। সুয্যিমামাও গা থেকে চাদর সরাননি তখন। আমরা উঠে স্নান সেরে ব্যাগপত্তর নিয়ে যখন বেরলাম, তখন সাড়ে চারটে হবে। চারিদিকে হালকা কুয়াশার চাদরে ঢাকা। পুব আকাশটা লাল হয়ে এসেছে।

আমরা চলেছি লাইটলুম (laitlum) গ্রামে। হোটেল থেকে বেরিয়ে পনেরো-কুড়ি মিনিট মতো সময় লাগল সেখানে পৌঁছাতে। কেউ কোথাও নেই। ফাঁকা আর ফাঁকা। অতো ভোরবেলা আর কেই বা আসবে! গাড়ি থেকে নেমে হেঁটে হেঁটে এগোতে লাগলাম।

লাইটলুমকে গ্রাম না বলে উপত্যকা বলাই ভাল। উপত্যকা সাথে গিরিখাত। ইংরেজিতে যাকে বলে canyon। গিরিখাতের মধ্যে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে বেশ কয়েকঘর বাড়ি। উপত্যকায় স্থানীয় বসতি চোখে পড়ল না, তবে আছে বেশ কিছু দোকান। যদিও একটা দোকানও খোলা নেই। অনেক দূরের ওই মানুষের বসতি থেকেই মানুষজন এসে দোকানপাট চালান। একজন সেই দূর থেকে হেঁটে হেঁটে এদিকেই আসছেন। হয়তো তাঁর দোকান আছে এখানে। আমাদের দেখে এগিয়ে আসছেন দোকান খুলতে।

উপত্যকাটি খুব বেশি বিস্তৃত নয়। খাসি ভাষায় লাইটলুম শব্দের অর্থ হল ‘পাহাড়ের শেষ’। প্রান্তভাগে গেলেই দেখা যায় গভীর গিরিখাত। সেই গিরিখাতের মধ্যে দিয়ে তিরতির করে বয়ে গেছে একটা সরু নদী। আর চারপাশে সার বেঁধে দাঁড়িয়ে আছে সবুজ পাহাড়। সারাদিন এখানে বসে থাকা যায় পাহাড়ের দিকে তাকিয়ে। এটাই মেঘালয়ের বৈশিষ্ট্য। যে কোনো জায়গায় দাঁড়িয়ে পড়লেই হল। পরপর পাহাড়। পাহাড়ের সারি। আমরা যে উপত্যকায় দাঁড়িয়ে আছি, সেখান থেকেই পাহাড়ের গা বেয়ে নেমে গেছে সরু পায়ে হাঁটা পাথুরে পথ। একদম নীচে চলে গেছে সে পথ। পাহাড়ের পাদদেশে। সেখানে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে বেশ কয়েকঘর বাড়ি। কিছুক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকার পর দেখলাম সেই পথ বেয়ে অনেক নীচ থেকে উঠে আসছে বেশ কয়েকজন। বয়স বেশি না। পিঠে তাদের ব্যাগ। স্কুলে যাচ্ছে মনে হয়। মধ্যবয়স্ক অনেকে চলেছেন নিজ নিজ কাজে।

আকাশটা ক্ষণে ক্ষণে রং বদলাচ্ছে। অপরূপ সেই রং বদলের খেলা। আশেপাশে কয়েকটা ঘোড়া বাঁধা আছে দেখলাম। স্থানীয় মানুষদের হতে পারে। টুরিস্টদের ঘোড়ার পিঠে করে ঘোরায় হয়তো। সূর্য উঠছে ধীরে ধীরে। দূরে পাহাড়ের সারির ওপরে উজ্জ্বল রং লাগছে। মায়াময় মেঘালয়। রূপসী মেঘালয়। মেঘময় মেঘালয়।

কিন্তু যে দৃশ্য দেখার জন্য ভোর বেলা উঠে লাইটলুম উপত্যকায় এসেছিলাম, সে দৃশ্য দেখা হয়নি। সে দৃশ্য যে আজ আমাদের দেখা হবে না তা আমরা এখানে পা দিয়েই বুঝতে পেরেছিলাম। ড্রাইভার দাদা বলেছিলেন, ভোর ভোর যদি যেতে পারি, তাহলে দেখতে পাব গিরিখাতের মধ্যে মেঘ জমে আছে। আমরা যেখানে দাঁড়িয়ে থাকব, মেঘ থাকবে আমাদের নীচে। তবে আজ সে দৃশ্য আমাদের ভাগ্যে ছিল না। তবুও যে অপরূপ রূপ আমরা দেখলাম, তা কি কম?

দোকান খুলছে ধীরে ধীরে। সবাই এক কাপ করে চা আর একটা করে কেক খেয়ে আমরা আবার বেরিয়ে পড়লাম। এরপর আমরা যাব গুয়াহাটির দিকে। মাঝে পুলিশ বাজারে ঘণ্টাখানেকের জন্য দাঁড়াব। সেখান থেকে কারুর কিছু কেনাকাটার দরকার থাকলে কিনে নিয়ে জলখাবার খেয়ে সোজা ছুটব গুয়াহাটির দিকে।

শিলঙে সবাই প্রায় বাংলা বোঝেন। বলতেও পারেন। পাশে আসাম থাকার কারণে হতে পারে। এখানে বাঙালির সংখ্যাও নেহাত কম নয়। দোকানগুলোতে বাঙালি পর্যটক দেখলে দোকানীরা সকলেই প্রায় বাংলাতেই কথা বলছেন। তবুও তার মাঝেও অনেক বাঙালি পর্যটক লালমোহন গাঙ্গুলির মতো বাংলা ছেড়ে হিন্দিতেই কথা চালিয়ে যাচ্ছেন। আমরা, বাঙালিরা নিজের ভাষা নিয়ে এতো হীনমন্যতায় কেন ভুগি কে জানে!

শিলং-গুয়াহাটি রোড ধরে গুয়াহাটির দিকে যখন রওনা দিলাম তখন বেলা দশটা বাজে। গন্তব্য কামাখ্যা স্টেশন। যে পথে এসেছিলাম, সেই একই পথে ফিরছি। উমিয়াম লেক এবার বাঁদিকে। শেষ বারের মতো সেই নীল জলে মনে মনে ডুব দিয়ে পাহাড়ি পথ ধরে ধীরে ধীরে আমরা নীচে নামছি। পেছনে পড়ে রয়েছে পুলিশ বাজার, শিলং, চেরাপুঞ্জি, রুট ব্রিজ, নংরিয়েত গ্রাম, মওলাখিয়েত গ্রাম, ডাউকি নদী, ঈশ্বরের নিজের বাগান, পাহাড়ি উপত্যকা এবং আরও অনেক কিছু।

মনের আঙিনায় উঁকি দিচ্ছে ফিবান সিমাইয়াসের মতো অনেকগুলো মায়ামাখা মুখ। তারা যেন হাত বাড়িয়ে দিচ্ছে, তারা জড়িয়ে ধরছে আমাকে। মায়ার বাঁধনে চিরদিনের জন্য বেঁধে রেখে দিতে চাইছে তাদের নিজের দেশে। মরমী মেঘালয় তার মানবী রূপে ফিবানের বেশে যেন ফিসফিস করে বলছে, আমি আছি, ওহে বঙ্গ যুবক, আমি আছি। ক্লান্ত শ্রান্ত শরীরে তুমি কিছুতেই মরবে না। মায়ের মতো আঁচল পেতে আমি আছি এখানে, সারাজীবনের জন্য।

কত কিছুই তো দেখতে পারিনি। ঘোরার মধ্যে ঘুরেছি শুধু খাসি পাহাড়ের পূর্বদিকের কয়েকটি জায়গা। খাসি পাহাড়ের পশ্চিম দিক আর সমগ্র গারো আর জয়ন্তিয়া পাহাড় রয়ে গেছে বাকি। এর মধ্যে আবার পায়ের ব্যথায় কাবু হয়ে থেকেছি দু-তিন দিন। সম্পূর্ণ সুস্থ এখনও নই। তবুও মেঘের এই দেশ তার অনির্বচনীয় রূপের ডালি উজাড় করে দিয়েছে আমার সামনে। জীবনে আর কিছু তো চাইনি আমি। কিছু তো পারিনি আমি দিতে। তবুও এই রূপসী মেঘালয় আর তার বাসিন্দারা তাদের সরল মনের মাধুরী মিশিয়ে উজাড় করা ভালোবাসা নিয়ে ধরা দিয়ে আমার কাছে মোহময়ী রূপে।

এর চেয়ে শ্রেষ্ঠতর প্রাপ্তি আর কি কিছু আছে? (সমাপ্ত)

✦ ──── ❦ ──── ✦
Visual Chronicles

Photographic Plates from the Field

Plate 2
PLATE 2 • FIELD EVIDENCE
Plate 3
PLATE 3 • FIELD EVIDENCE
Plate 4
PLATE 4 • FIELD EVIDENCE
Plate 5
PLATE 5 • FIELD EVIDENCE
Plate 6
PLATE 6 • FIELD EVIDENCE
Plate 7
PLATE 7 • FIELD EVIDENCE
Plate 8
PLATE 8 • FIELD EVIDENCE
Plate 9
PLATE 9 • FIELD EVIDENCE
Plate 10
PLATE 10 • FIELD EVIDENCE
Plate 11
PLATE 11 • FIELD EVIDENCE
Plate 12
PLATE 12 • FIELD EVIDENCE
Plate 13
PLATE 13 • FIELD EVIDENCE
Plate 14
PLATE 14 • FIELD EVIDENCE
Plate 15
PLATE 15 • FIELD EVIDENCE
Plate 16
PLATE 16 • FIELD EVIDENCE
Plate 17
PLATE 17 • FIELD EVIDENCE
DISPATCH WIRE:
Next Expeditions

Continue the Cultural Journey

✉ Correspondence Archive

Curator's Postbox

📬6 Letters on file
PEN YOUR LETTERYour thoughts become part of the permanent record
#01
বীথি ইসলাম
Aug 18, 2026

ফুপা, ভালো হইসে লেখাটা। আপনে সব গল্পের শ্যাষেরটায় এমন লেখেন ক্যানে? মনে হয় আরো কিসু লিখব্যান!!! যাহোক গে। আপ্নের ল্যাখা আমার ভালো লাগসে। ফুপির শরীরখান গরম আইসে, ঘুমায়ে গেসে। বলবোনে যে আপনি লেখা দিসেন, তার আগে ফুপির তরফ থেইক্যা অনেকগুলা 😘😘😘😘😘😘😘😘😘😘😘😘😘

#02
বীথি ইসলাম
Aug 18, 2026

ওই বেডা এডমিন, লেখকের ডিটেইলস থাইকলে দ্যান এহানে।

AdminAug 19, 2026

@বীথি ইসলাম আপনার desperation দেখে অবাক ও হচ্ছি, মজা ও লাগছে😂 আপনি এক কাজ করুন, আপনার ফুপিকে নিয়ে ভারতে আসুন। আপনার ফুপি যখন লেখকের interview নেবে, আপনি না হয় তখন আমার সাথে এক কাপ কফি ☕️খেলেন!! 😉

বীথি ইসলামAug 19, 2026

@admin বাব্বাহ হঠাৎ আপ্নের ভোল বদল হইলো যে!! আসুম যখন, দেখবনে কত কফি খাইতে পারেন আপনে!@ আমি কফি খাই না, আমার জন্যে শুধু ঘন দুধের সর দেওয়া টঙ।

AdminAug 19, 2026

@বীথি ইসলাম আচ্ছা, আপনার জন্য ঘন দুধের সর দেওয়া চা থাকবে, আপনি চাইলে আমি নিজেও বানিয়ে খাওয়াতে পারি আপনাকে😌

বীথি ইসলামAug 19, 2026

@admin আগে যে মেজাজ দেখাইলেন, সেইটার জন্যে মাফি চান নাই এখনো, যাইকগে, মাইফ কইরা দিসি। আপনেও খুব ভালো। 😌❤️

AdminAug 20, 2026

@বীথি ইসলাম ধন্যবাদ। অন্য লেখাগুলো পড়ার অনুরোধ করতে পারি কি? 🥺

বীথি ইসলামAug 20, 2026

@admin পড়ুম তো অবশ্যই। আপনে একটা বলেন, সেইডা সবার প্রথম পড়ুমনে না হয়!😌

AdminAug 21, 2026

@বীথি ইসলাম সব লেখাই ভালো। আমরা লেখা পড়ে, বিচার করে তারপরেই এখানে লেখা ছাড়ি। আপনি যখন বলছেন, তাহলে বলবো এই লেখাটা পড়তে পারেন👉 https://www.mrkhajuraho.com/post/6a7c124de89931fc1911d1e0

#03
রেজওয়ানা পারভীন
Aug 19, 2026

খুব ভালো হইসে লেখাখানি। বীথি হাতে-পায়ে বড় হইলেও মনডা এখনও পিচ্চি। ওর কথায় খারাপ নিয়েন না। আমি ওর হয়ে মাফ চাইতাসি। আপ্নের লেখার হাত খুব সুন্দর, আরও ল্যাখা দিয়েন, পড়ুমনে।

বীথি ইসলামAug 19, 2026

@রেজওয়ানা পারভীন ফুপি, আজকে তো উনারে ভাইয়া কইলেন না!! 🤭🤭🤭🤭

AuthorAug 19, 2026

@রেজওয়ানা পারভীন ধন্যবাদ আপু। ভাল থাকবেন।

অনির্বানAug 19, 2026

@রেজওয়ানা পারভীন আপু, লেখকের সাথে দেখা করার জন্য এপার বাংলায় আপনাদের আমন্ত্রণ রইল।

#04
অনির্বান
Aug 19, 2026

খুব ভালো হয়েছে।

AuthoAug 20, 2026

@অনির্বান ধন্যবাদ 🌻

AdminAug 20, 2026

@অনির্বান ধন্যবাদ আপনাকে। অন্যান্য লেখাগুলো পড়ে দেখার অনুরোধ রইলো🙏 ভালো লাগলে like comments ও share করবেন। সমালোচনা ও অগ্রগণ্য।

#05
ইপ্সিতা
Aug 22, 2026

আপনার লেখা পড়ে সত্যিই খুব লাগলো, আরও নতুন কিছু পড়ার অপেক্ষায় থাকলাম।

AuthorAug 22, 2026

@ইপ্সিতা ধন্যবাদ। হ্যাঁ, নতুন কিছু তো অবশ্যই আসবে।

#06
ইপ্সিতা
Aug 22, 2026

আপনার সাথে একবার দেখা ইচ্ছা আছে,যদি কখনও সেটা সম্ভব হয় সত্যিই খুব ভালো লাগবে।☺️

AuthorAug 22, 2026

@ইপ্সিতা পৃথিবীটা খুব ছোটো, কখন কার সাথে কোথায় কীভাবে যে দেখা হয়ে যাবে, আমরা কেউই জানি না... ভালো থাকবেন।🌻

✦ END OF CORRESPONDENCE LEDGER — 6 LETTERS ON RECORD ✦
0%
READ
6