Mr.Khajuraho - Curated Global Insights. Stories That Matter.
Return to Archives
✦ ARCHIVE DISPATCH № KH-0394READING TIME: 13 MIN
#Cultural#Socio-Cultural

নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (অন্তিম পর্ব)

Jul 30, 2026Chronicled by একলব্য 218 Reader Explorations
নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (অন্তিম পর্ব)
ARCHIVAL FIELD PLATE I — নাস্তিকের তীর্থযাত্রা (অন্তিম পর্ব)AUTHENTICATED RECORD

্বিতীয় পর্বের লিঙ্ক: https://www.mrkhajuraho.com/post/6a69b92a8b11579fdc979d9c ↗

অনির্বাণ যখন ডাকল তখন রাত পৌনে একটা বাজে। ওরা স্নান করে রেডি। একটা টোটোওয়ালাকে বলা হয়েছিল ওই রাতে এসে মন্দিরে পৌঁছে দেওয়ার জন্য। টোটো আসবে একটায়। আমি উঠে পড়লাম। ঠিক করলাম যাব। একটা দিনের তো ব্যাপার। দেখেই আসি বারানসীর ঘাটগুলো রাতের বেলা কেমন দেখায়। আর যদি কখনও না পাই এই সুযোগ!

পুজো যেহেতু দেবো না, তাই স্নান করারও প্রশ্ন নেই। জামা প্যান্ট পরে বেরিয়ে পড়লাম ওদের সাথে। রাজীব একা থাকল ঘরে। টোটো যখন আমাদের নামিয়ে দিল তখন দেড়টার একটু বেশি বাজে। অনির্বাণ আর সৌভিক লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। লাইন তখনও বেশ বড়। আগেরদিন লাইনের শেষে যাঁরা ছিলেন, তারা পুজো দিতে পারেননি। তাই লাইনের শুরুতে তাঁরা রয়ে গেছেন। তাঁদের পরে ওরা দুজন লাইনে দাঁড়িয়ে পড়ল। ভোর তিনটে থেকে আবার নতুন দিনের পুজো শুরু হবে। আমি এবার একা।

চললাম ঘাটের দিকে। রাস্তায় তখনও অনেক লোক। আগেরদিন পুজো শেষে ফিরছেন অনেকে। আমি ঘাটে যাওয়ার আগে বসলাম রাস্তার ধারের একটা ফাঁকা বেঞ্চিতে। একা বসে আছি আর লোকজনের আসা যাওয়া দেখছি। এই জঙ্ঘম আসা যাওয়ার মাঝে আমি যেন স্থবির একজন। জীবনের দুই বিপরীত রূপ। কাছেই দশাশ্বমেধ ঘাট। সেদিকে যাচ্ছে অনেকে। অনেকে আবার ফিরছে সেদিক থেকে। আশেপাশে বন্ধ দোকানের সামনেও অনেকেই শুয়ে আছে। তাঁদের অনেকেই স্থানীয় মানুষ, ঠেলাওয়ালা দোকানদার। অনেকেই আবার দর্শনার্থী। কিছুক্ষণ বসে থাকার পর আমি শুয়ে পড়লাম ফাঁকা বেঞ্চিটায়। ওপরে পরিষ্কার খোলা আকাশ। আমি একটা মাত্র জামা পরে আছি। খোলা আকাশের নীচে বেশ ঠাণ্ডা লাগছিল আমার। মনে হচ্ছিল একটা গরম পোশাক সাথে থাকলে খুব ভাল হতো। ঘরে আছে, কিন্তু বেরোনোর সময় সাথে নিলাম না। সবে দুটো বাজে। এখনও এভাবে কাটাতে হবে আরও অনেকক্ষণ।

কখনও কি ভেবেছিলাম সুদূর বারানসীতে এসে মাঝরাতে কাঠের বেঞ্চিতে শুয়ে শুয়ে আকাশ দেখব?

ঠাণ্ডা লাগছিল খুব। শুয়ে থাকতে থাকতেই একটা নতুন ভাবনা হাতেকলমে অনুভূত হল। এতদিন যে এসব ভাবিনি বা দেখিনি তা নয়, কিন্তু আজ নিজে অনুভব করলাম। আমার কয়েক ঘণ্টার জন্য গরম জামার অভাবেই আমি কাতর হয়ে পড়েছি। আমার তো তবুও পোশাক আছে। কিন্তু দেশের আরও কতশত মানুষ যে পোশাকের অভাবে প্রতিরাতে কষ্ট পায়!

সামনেই শিবরাত্রি। আকাশে উজ্জ্বল চাঁদ। ঠিক করলাম, তিনটে নাগাদ যাব ঘাটের কাছে। আকাশে চাঁদের অবস্থান পরিবর্তন হচ্ছে একটু একটু করে, আর আমি ঘড়ি দেখছি। এদিকে ঠাণ্ডাও লাগছে। ঘাটে গেলে খোলা গঙ্গার হাওয়ায় না জানি আরও কেমন লাগবে।

এসব সাতপাঁচ ভাবতে ভাবতে উঠে পড়লাম। সামনে একটা চায়ের দোকান এখনও খোলা। কয়লায় আঁচ আছে সেখানে। হাতদুটো বুকের কাছে জড়সড় করে গেলাম সেখানে। একটা চায়ের কাপ নিয়ে বসলাম সেই আঁচের পাশে। একটু যেন স্বস্তি পেলাম। কিন্তু বেশিক্ষণ এখানে থাকা যাবে না। নয়তো ঘাটের অনেক দৃশ্য হয়তো বাদ পড়ে যেতে পারে। চা খেয়ে দাম মিটিয়ে উঠে পড়লাম।

ভেবেছিলাম ঘাট ফাঁকা থাকবে। কিন্তু দশাশ্বমেধ ঘাটে এসে দেখলাম অনেক লোকজন সেখানে। নতুন নতুন লোকজন আসছে অনেক। সারারাত ধরেই মানুষের আনাগোনা। তবে বলাই বাহুল্য, দিনের বেলার চেয়ে ভিড় কম অনেকটাই। বাঁধানো সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামলাম। ওই ভোর রাতেই স্নান করছে অনেকে। মহিলারাই বেশি। রাতের আঁধারকেই তাঁরা লজ্জা নিবারণের চাদর করে ভক্তি ভরে ডুব দিচ্ছেন মা গঙ্গার বুকে।

দশাশ্বমেধ ঘাটে বেশিক্ষণ দাঁড়াতে ইচ্ছা হল না। কারণ সেখানে বসার জায়গা নেই। আর এ ঘাট যেন সবসময় জীবন্ত। মানুষের কোলাহলে পূর্ণ। ঘাট ধরে দক্ষিণ দিকে এগোলাম আমি। আগেরদিন দুপুরের দিকে আমরা নেমেছিলাম পেশোয়া ঘাটে। যেটা আরও উত্তরে। দশাশ্বমেধ ঘাটের ওপাশে। আর আজ দশাশ্বমেধ ঘাটের এপাশে আরও দক্ষিণে হাঁটছি আমি। একে একে এল রাজেন্দ্র প্রসাদ ঘাট, প্রয়াগ ঘাট, শীতলা ঘাট, দারভাঙ্গা ঘাট, রাণা মহল ঘাট, চৌসট্টী ঘাট। যত এগোচ্ছি, লোকজন ততো কমছে। তারপর থামলাম একটা ঘাটে। ঘাটের নাম দিগপতিয়া ঘাট। অন্ধকারাচ্ছন্ন চারিদিক। কোলাহলমুক্ত। গঙ্গার একদম পাশে অনেকটা উঁচু প্রশস্ত বাঁধানো চাতালের মতো একটা জায়গায় উঠে বসলাম। জায়গাটা বেশ মনোমত হল। আকাশে তখনও উজ্জ্বল চাঁদ। চাঁদের রুপোলী আলো খেলা করছে নদীর জলে। দূরে আমার বামদিকে মণিকর্ণিকা আর দশাশ্বমেধ ঘাটের আলোয় মানুষের আবছা অবয়ব দেখা যাচ্ছে, ডানদিক ক্রমশ বেঁকে গেছে দূরে অসসি ঘাটের দিকে। গঙ্গার ধারে ধারে স্নানরত মানুষের ছায়াময় কায়াগুলো যেন জীবনের জলছবি।

দিনের বেলা যে নৌকা-স্টিমারগুলোতে করে গঙ্গা ভ্রমণে বার হয় মানুষ, অন্ধকারে সেগুলো সার দিয়ে বাঁধা আছে ঘাটের কাছে। গঙ্গার মৃদু স্রোতে সেগুলো কবিতার ছন্দে দোদুল্যমান। প্রায় নির্ঘুম রাতের ক্লান্তি আমার আর নেই। নির্জন নদীর ধারে বসে থাকলে সবসময়ই দেখেছি আমার মধ্যে যেন একটা বৈরাগ্য ভাব আসে। নদীর সাথে কেমন যেন একটা নিঝুম সম্পর্ক তৈরি হয়ে যায় ক্ষণিকের জন্য। অথচ, নদীতীরবর্তী অঞ্চলে আমার জীবন কাটেনি কখনও। তবুও, নদীর বহমানতা যেন আমাকে আচ্ছন্ন করে রাখে সবসময়। আচার্য জগদীশ চন্দ্র বসু গঙ্গাকে জিজ্ঞাসা করেছিলেন, “নদী তুমি কোথা হইতে আসিতেছ?” আমার মনে প্রশ্ন জাগে, “নদী তুমি যাও কোথা?”

মানুষের জীবনই বা কোথায় যায়? আমাদের জীবনও কি নদীর মতো? পাপ-পুণ্যের ওপর নির্ভর করে কি ঠিক হয় জীবনের প্রবাহমানতা? পাপ-পুণ্য জিনিসটাই বা কী? নিছকই একটা আধ্যাত্মিক ধারণা, নাকি সত্যিই এর কোনও সারবস্তু আছে?

নিজেকে কেমন যেন খুব ক্ষদ্র মনে হয়। এই বিশাল জগতসংসারে আমি কে, আমার ভূমিকাই বা কী? পৃথিবীর কোনও কিছু কি নির্ভর করে আমার থাকা না-থাকার ওপর?

পুব আকাশে ক্ষীণ লাল আভা ধরেছে। আমি নেমে পড়লাম। আরও এগিয়ে যেতে হবে। সব ঘাটগুলো যে দেখা হয়নি এখনও। আবার চলতে শুরু করলাম। পাণ্ডে ঘাট, বাবুয়া পাণ্ডে ঘাট, রাজা ঘাট, নারদ ঘাট, মানসরোবর ঘাট। ঘাটগুলো জনবিরল। তবে একেবারে জনবিরল বললে অবশ্য ভুল বলা হবে। এদিকের ঘাটগুলোতে ছোট ছোট ঝুপড়ি বেঁধে রয়েছেন নাঙ্গা সাধুরা। ছাই-ভস্ম মেখে তাঁরা কল্কে টানছেন। ধুনি জ্বলছে তাঁদের সামনে। কেউ কেউ পুন্যার্থি দেখলে হাত উঁচু করে আশীর্বাদ করে দক্ষিণা চাইছেন। কেউ কেউ নেহাত ঝুপড়ির মধ্যে গুটিসুটি মেরে শুয়ে আছেন এখনও। যত এগোচ্ছি, নাঙ্গা সাধুবাবাদের সংখ্যা বাড়ছে।

সব ঘাটের দৃশ্য মোটামুটি একই রকম। ঘাটের নামগুলো শুধু আলাদা। ঘাটের পাশের পুরনো বাড়িগুলোতে দর্শনার্থীদের থাকার ব্যবস্থা আছে। নাম লেখা আছে বিভিন্ন হোটেলেরও। একে একে ক্ষেমেস্বর ঘাট, চৌকী ঘাট, কেদার ঘাট পেরিয়ে এলাম হরিশ্চন্দ্র ঘাটে। এই জায়গাটায় বেশ ভিড় আছে। স্টিমার থেকে লোকজন নামছে এই ঘাটে। স্নান করছেন অনেকে। মণিকর্ণিকা ঘাট ছাড়া একমাত্র এই হরিশ্চন্দ্র ঘাটেই শ্মশান আছে। বারানসীর ঘাটগুলোর মধ্যে সবচেয়ে প্রাচীন ঘাট হিসাবে ধরা হয় এই হরিশ্চন্দ্র ঘাটকে। ঘাটের ওপরেই চুল্লি দেখলাম। প্রয়োজন মতো ব্যবহার করার জন্য চারিদিকে কাঠের স্তূপ।

এই ঘাট নিয়ে একটা পৌরাণিক কাহিনী মানুষের মুখে মুখে ছড়িয়ে পড়েছে। সেটা অনেকটা এই রকম—

মার্কণ্ডেয় পুরাণ অনুযায়ী, ত্রেতা যুগে হরিশ্চন্দ্র নামে একজন মহান রাজা ছিলেন। তাঁর স্ত্রীর নাম ছিল শৈব্য এবং তাঁদের একমাত্র ছেলের নাম ছিল রোহিতাশ্য। একদিন রাজা হরিশ্চন্দ্র শিকারে বেরিয়ে একটা বিপদগ্রস্থা নারী কণ্ঠের আর্ত চিৎকার শুনতে পেলেন। চিৎকার শুনে রাজা সেই দিকে গেলেন। আসলে বিঘ্নরাজ নারীর বেশে ওই ছল শব্দের মাধ্যমে মুনি বিশ্বমিত্রের ধ্যান ভঙ্গ করতে চাইছিলেন; এই শব্দ লক্ষ্য করেই রাজা হরিশ্চন্দ্র এগিয়ে এসেছিলেন। এমতাবস্থায় ওই স্থানে তাঁকে দেখে বিঘ্নরাজ মায়াবলে তাঁর শরীরের মধ্যে প্রবেশ করে বিশ্বমিত্রকে আরও উত্যক্ত করতে লাগলেন। বিশ্বমিত্রের ধ্যান ভঙ্গ হল অচিরেই। আর সামনেই রাজা হরিশ্চন্দ্রকে দেখে তিনি রেগে গেলেন।

এরপর হরিশ্চন্দ্র প্রকৃতিস্থ হলে, অর্থাৎ, বিঘ্নরাজের কবল থেকে মুক্তি পেলে সমস্ত ব্যাপার বুঝে বিশ্বমিত্রকে সব কথা বললেন এবং ক্ষমা চাইলেন। এর সাথেও এও বললেন যে, দোষ মুক্তির জন্য ঋষি বিশ্বমিত্র যা চাইবেন তাই দেবেন। এই কথা শুনে ঋষি তাঁর রাজসূয় যজ্ঞের জন্য দক্ষিণা চাইলেন এবং বললেন যে, রাজা নিজে এবং তাঁর স্ত্রী – পুত্র ছাড়া আর যা কিছু আছে সবই যেন তাঁকে প্রদান করেন। রাজা তাই করলেন। তাঁর সমস্ত রাজ্য, ধন সম্পত্তি এমনকি নিজের পোশাকটুকুও তিনি ঋষিকে দক্ষিণা হিসাবে প্রদান করেন।

কিন্তু এরপরেও ঋষি সন্তুষ্ট না হলে রাজা অর্থ উপার্জনের জন্য কাজ করতে শুরু করেন এক মাসের মধ্যে ঋষিকে সন্তুষ্ট করবেন বলে কথা দেন। তাঁর অনুগত সভাসদ এবং প্রজারা রাজাকে খুব ভালবাসতেন। রাজাকে কাজ করতে দেখে তাঁরাও রাজার সাথে রাজাকে সাহায্য করার জন্য কাজ করতে শুরু করেন। ঋষি এই ঘটনায় ক্ষুব্ধ হন। কারণ, সভাসদ এবং প্রজারা রাজ্যের অংশ, এবং সব সম্পত্তি সহ রাজা তাঁর রাজ্য ঋষিকে দান করে দিয়েছেন। কিন্তু এর পরেও রাজা তাঁদের নিয়েই কাজ করছেন।

হরিশ্চন্দ্র তখন পরিবার নিয়ে সেই রাজ্য ত্যাগ করেন। এবং অনেক জায়গা ঘুরে ঘুরে অবশেষে কাশীতে এসে উপস্থিত হন। রাজা সেখানে এসে দেখলেন যে ঋষি সেখানে আগে থেকেই এসে রয়েছেন এবং হরিশ্চন্দ্রকে দেখে তিনি তাঁর প্রাপ্য দাবি করেন। এক মাস পূর্ণ হতে তখনও কিছু সময় বাকি ছিল। ঋষি তখন পরেরদিন সূর্যাস্তের আগে আবার আসবেন বলে সেদিনের মতো বিদায় নেন।

এদিকে অনাহারে তাঁর স্ত্রী এবং বিশেষত তাঁর পুত্রের অবস্থা কাহিল হয়ে পড়েছিল। এদিকে ঋষিকে দেওয়ার মতো অর্থও তিনি তখনও অর্জন করতে পারেননি। এই অবস্থা থেকে মুক্তির জন্য তাঁর স্ত্রী রাজাকে পরামর্শ দিলেন তাঁকে বেঁচে দিতে, এবং এর দ্বারা প্রাপ্ত অর্থে ঋষিকে সন্তুষ্ট করে পাপ মুক্ত হতে। নিরুপায় রাজা তখন একজন বয়স্ক লোকের কাছে তাঁর স্ত্রীকে বেঁচে দিলেন এবং তাঁর পুত্র মাকে ছেড়ে থাকতে না চাওয়ায়, সেও মায়ের সাথে চলে যায়। স্ত্রী-পুত্রকে বেঁচে প্রাপ্ত অর্থ রাজা ঋষিকে প্রদান করেন। কিন্তু তাতেও তিনি ঋষির সন্তুষ্টি অর্জনে ব্যর্থ হন। রাজা এবার নিজেকে বেঁচে দিতে চান। স্থানীয় একজন চণ্ডাল রাজাকে কিনতে চাইলে ক্ষত্রিয় রাজা একজন চণ্ডালের কাছে নিজেকে বিকিয়ে দিতে দ্বিধা বোধ করেন, পরিবর্তে ঋষি বিশ্বমিত্রের কাছে নিজেকে সমর্পণ করেন। ঋষি তখন বলেন, “যেহেতু তুমি আমার কাছে নিজেকে সমর্পণ করেছ, অর্থাৎ তুমি আমার দাস। তাই আমি যা বলব, তাই শুনতে এবং করতে তুমি বাধ্য থাকবে।” এই কথা বলে ঋষি সেই চণ্ডালের কাছে রাজাকে বিক্রি করে দেন।

চণ্ডাল কাশীতে গঙ্গার ঘাটে মৃতদেহ সৎকার করতেন। ঋষির কাছ থেকে হরিশ্চন্দ্রকে কিনে নিয়ে তাঁকে তিনি সেই কাজে নিযুক্ত করেন এবং মৃতদেহ সৎকারের জন্য প্রতি দেহ পিছু নির্দিষ্ট পরিমান মূল্য নিতে। সেই অর্থ তিন ভাগে ভাগ হবে, যার একটা অংশ যাবে স্থানীয় রাজার কাছে, আর একটা অংশ নেবে সেই চণ্ডাল নিজে, আর বাকি একটা অংশ পারিশ্রমিক হিসাবে পাবেন হরিশ্চন্দ্র স্বয়ং।

রাজা হরিশ্চন্দ্র যে ঘাটে মৃতদেহ সৎকারের কাজ করতেন, সেই ঘাটেই আমি দাঁড়িয়ে আছি। তাঁর নামেই এই ঘাটের নাম হরিশ্চন্দ্র ঘাট।

তবে গল্পটা শুরু যখন করেছি, শেষ পর্যন্ত বলি।

এভাবেই চলছিল সব কিছু। এরপর একদিন হরিশ্চন্দ্র দেখলেন তাঁর স্ত্রী তাঁদের মৃত সন্তানকে কোলে নিয়ে শ্মশানে এসেছেন দেহ সৎকারের জন্য। তাঁর জন্য তাঁর স্ত্রী পুত্রের এই অবস্থা দেখে তিনি দুঃখে ক্ষোভে আত্মহত্যা করতে উদ্যত হলেন। কিন্তু তারপর ভাবলেন যে, পরের জন্মেও তাঁকে এই পাপের ফল ভোগ করতে হবে, তাই আত্মহত্যায় খুব একটা লাভ নেই।

এরপর নিজের সন্তানের মৃতদেহ সৎকারে উদ্যত হওয়ার আগে তিনি নিয়ম অনুযায়ী স্ত্রীর কাছে দেহ সৎকারের জন্য নির্দিষ্ট মূল্য দাবি করেন।

কর্মের প্রতি হরিশ্চন্দ্রের এইরূপ নিষ্ঠা দেখে যমরাজ স্বয়ং সেখানে উপস্থিত হন এবং তাঁকে সশরীরে স্বর্গারোহণের আহ্বান জানান। রাজা তখন যমরাজের আহ্বান অস্বীকার করে একা স্বর্গে যেতে না চেয়ে তাঁর সাথে সম্পর্কিত সমস্ত মানুষ, যারা তাঁর দুঃসময়ে তাঁর সাথে ছিল, তাঁদের সবাইকে নিয়ে স্বর্গে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করেন। দেবরাজ ইন্দ্র তখন তাঁর ইচ্ছা পূর্ণ করেন।

এই সময়েই ঋষি বশিষ্ঠ্যয়ের বারো বছরের তপস্যা শেষ হলে তিনি রাজা হরিশ্চন্দ্রের প্রতি ঋষি বিশ্বমিত্রের এরূপ কঠোর আচরণের কথা জানতে পেরে তাঁর সাথে কলহ করেন। কিন্তু প্রজাপতি ব্রহ্মা ঋষি বশিষ্ঠ্যকে আশ্বস্ত করে বলেন যে, হরিশ্চন্দ্রকে পরীক্ষা করার জন্যই বিশ্বমিত্র এরূপ আচরণ করেছিলেন। সেই পরীক্ষায় রাজা সফল হয়েছেন তাঁর কর্মের মাধ্যমে। এবং সেই জন্যই তাঁর স্বর্গপ্রাপ্তি ঘটেছে।

এই হল রাজা হরিশ্চন্দ্রের গল্প।

হরিশ্চন্দ্র ঘাট থেকে আরও এগিয়ে যেতে থাকলাম। একে একে এল হনুমান ঘাট, গুলারিয়া ঘাট, শিবালা ঘাট, মহানির্বাণী ঘাট, নিরঞ্জনী ঘাট, চেত সিং ঘাট, প্রভু ঘাট, পঞ্চকোট ঘাট, শ্রী নিষাদরাজ ঘাট, জৈন ঘাট, বাচ্চারাজা ঘাট, মাতা আনন্দময়ী ঘাট। মাঝে মাঝে দাঁড়াচ্ছি কোনও কোনও ঘাটে। সূর্য না উঠলেও আকাশ ফর্সা হয়ে এসেছে। পুব দিকের আকাশে নববধুর রাঙানো সিঁথির লাল আভা। সামনে এখনও বেশ কয়েকটা ঘাট বাকি। রাতের সেই শীতভাবটা অতটা প্রবল আর নেই। ঘাটের পাশের উঁচু উঁচু দেওয়ালে বিভিন্ন ছবি আঁকা। যাকে ‘গ্রাফিত্তি’ বলে। অনেক জায়গায় দেখলাম এই ভোর থেকেই আকার সরঞ্জাম নিয়ে তৈরি হচ্ছে শিল্পীরা। নিপুণ তুলির টানে দেওয়ালে ফুটিয়ে তুলবেন তাঁদের নতুন কোনও শিল্পকর্ম। গঙ্গায় স্টিমারে করে দূর দূরান্ত থেকে ভেসে আসছেন অনেক মানুষ। ঘাটগুলো ভরে উঠছে তাঁদের কলরবে। শীতল গঙ্গার বুকে অবগাহনে রত নরনারীরা। ঘাটে দাঁড়িয়ে প্রার্থনা করলাম, ধুয়ে যাক সবার মনের সমস্ত কালিমা। কার কাছে প্রার্থনা করলাম কে জানে। আমার তো প্রার্থনা করার কেউ নেই। আমরা কার কাছে প্রার্থনা করি? ঈশ্বরের কাছে, নাকি নিজের কাছেই?

আমি আজলা ভরে সমস্ত দৃশ্য কুঁড়িয়ে নিতে নিতে আবার হেঁটে চললাম। পথঘাটের পাগল কাগজকুড়ুনির চেয়ে আমার ভূমিকা খুব বেশি নয়।

একে একে এলো জানকী ঘাট, বদৈনী ঘাট, তুলসী ঘাট, রীওয়া ঘাট, গঙ্গা মহল ঘাট এবং সব শেষে অসসি ঘাট। বারানসীর ঘাটগুলোর মধ্যে দক্ষিণতম এই ঘাটের নামকরণ হয়েছে অসসি নদী থেকে। এখানেই অসসি নদী এসে মিশেছে গঙ্গায়। বেনারস হিন্দু বিশ্ববিদ্যালয় থেকে খুব বেশি দূরে নয় এই ঘাট, যদিও সেখানে আমার যাওয়া হয়ে ওঠেনি। তাই দেশি-বিদেশী অনেক ছাত্র-ছাত্রীরা এই ঘাটে এসে বসেন। আর আর একটা খুব ভাল ব্যাপার হল অন্য সব ঘাটের চেয়ে এখানে জায়গা অনেক বেশি।

অসসি ঘাটে অনেকক্ষণ ছিলাম। লোকজনের সংখ্যা এখানেও কম নয়। আসা-যাওয়ার মাঝে আমি দাঁড়িয়ে আছি। গন্তব্যহীন পথিকের মতো। হেঁটে চলাই যেন আমার কাজ। তবুও আপেক্ষিকভাবে গন্তব্য হয়তো সবারই একটা থাকে।

এবার ফেরার পালা। সূর্যদেব উঠি উঠি করছেন। অনির্বাণদের পুজো দেওয়া হল কিনা কে জানে। হয়ে গেলে অবশ্য ফোন করত। আমি ফিরতি পথ ধরলাম। সেই ঘাটের পাশ দিয়েই। এবার চলেছি উত্তর দিকে। ডান দিকে গঙ্গা। বাঁয়ে সহস্র বছরের প্রাচীন বারানসীর স্থাপত্য।

আসার সময় দেখিনি, এখন দেখলাম ঘাটে ঘাটে দল বেঁধে বিদেশী বিদেশিনীর দল। নাঙ্গা সাধুদের মধ্যেও সাদা চামড়ার মানুষ দেখলাম বেশ কয়েকজন। অনেকে গেরুয়া বসন পরে ধ্যানরত। ধর্মের এই এক অদ্ভুত মাধুর্য। কে যে কোথায় কীভাবে মজে যাবে তা কেউ জানে না। যেখানে প্রাণের আনন্দ, অন্তরের শুদ্ধি তা নিয়েই থাকুক সব মানুষ।

আমি এগোতে থাকলাম। হরিশ্চন্দ্র ঘাটে এই ভোরবেলাতেই একটি মৃতদেহ সৎকারের তোড়জোড় চলছে। চুল্লিতে কাঠ সাজানো হচ্ছে। পাশেই রাখা মৃতার দেহ। মুখ বাদে শরীরের বাকিটুকু ঢাকা। কোমল মুখে মধ্যবয়সের ছাপ। একফালি নরম রোদ এসে পড়েছে সেই মুখের ওপর। শক্তি চাটুজ্যের সেই কবিতাটির কয়েকটা লাইন হঠাৎ মনে পড়ল।

“এখন খাদের পাশে রাত্তিরে দাঁড়ালে

চাঁদ ডাকে∶ আয় আয় আয়

এখন গঙ্গার তীরে ঘুমন্ত দাঁড়ালে

চিতাকাঠ ডাকে∶ আয় আয়

যেতে পারি

যে-কোনও দিকেই আমি চলে যেতে পারি

কিন্তু, কেন যাবো?

সন্তানের মুখ ধরে একটি চুমো খাবো”

এগিয়ে চললাম আবার। দশাশ্বমেধ ঘাটে এসে দেখি খুব ভিড়। লাইন দিয়ে যেতে হবে ওদিকের ঘাটগুলোতে। সেই লাইন একে বেঁকে বেশ বড়সড় অজগর সাপের আকার নিয়েছে। ভিড় দেখে লাইনে দাঁড়াতে আর ইচ্ছা করল না। বসলাম এক জায়গায়। ঘুম ভেঙ্গেছে সূর্যদেবের। সব আঁধার দূর করতে সোনালি আলোর সাথে এক মুঠো মিঠে উত্তাপ তিনি ছড়িয়ে দিয়েছেন চরাচরে। দশাশ্বমেধ ঘাটে স্নান করে সবাই যাচ্ছেন বিশ্বনাথ মন্দিরে। নরম রোদ গায়ে মেখে সকাল থেকেই নৌকাবিহার শুরু হয়েছে গঙ্গার বুকে।

ফোনটা বাজল এই সময়েই। ওদের পুজো দেওয়া হয়ে গেছে। আমিও উঠে পড়লাম। ভিড় ঠেলে পায়ে পায়ে বেরিয়ে এলাম ঘাটের বাইরে। চারিদিকে মানুষে মানুষে ছয়লাপ। মিনিট পনেরো পরে ওদের দেখা পেলাম। তারপর একটা দোকান থেকে সকালে প্রাতরাশ সেরে নিজেদের আস্তানায় ফিরলাম।

সারাদিনটা হোটেলেই ছিলাম। শুয়ে বসে আড্ডা দিয়ে কেটে গেল সময়টা। সন্ধ্যার পরপর বেরিয়ে পড়লাম। ট্রেন সেই ভোর পাঁচটা নাগাদ। মুঘলসরাই স্টেশন থেকে। খেয়ে দেয়ে বাকি সময়টা রেলের ওয়েটিং রুমে কাটাব বলেই ভেবেছিলাম। বারানসী থেকে অটো ধরে মুঘলসরাই পৌঁছে গেলাম নটার মধ্যেই। তারপর খেয়ে দেয়ে চলে গেলাম রেলের ওয়েটিং রুমে।

প্রায় চার ঘণ্টা লেট করার পর ট্রেন যখন ধরলাম তখন সকাল আটটা বেজে গেছে। এবার সোজা শিয়ালদা। সিট ছিল নীচের বার্থে। উঠেই বিছানা করে টানা তিনঘণ্টার ঘুম দিলাম। শরীরটা এবার বেশ ঝরঝরে লাগল। তারপর উঠে বসে হাত মুখে জল দিয়ে জানালা দিয়ে বাইরের দিকে চোখ রাখলাম। ট্রেন ছুটেছে দূর্বার গতিতে। কোডার্মা স্টেশন ছাড়িয়ে আমরা চলেছি ধানবাদের দিকে। আমার মন তখনও পড়ে রয়েছে বারানসীতে। ভেবে চলেছি, আমার মতো মানুষ তীর্থে গিয়ে কী পেল?

কী পেলাম তা সত্যিই জানি না। কে কোথায় কী পায়, তা কি জানা যায়? তবুও আমি অনবরত ভেবে চলেছি কী পেলাম। ভেসে উঠছে নানান দৃশ্যপট। কাউকে হয়তো বোঝাতে পারব না কী পেয়েছি। অর্পণ তর্পণ দেবদর্শন কিছুই হয়নি করা, তবুও যেন কানায় কানায় পূর্ণ হয়ে গেছে আমার মন। ভোরের শিউলি ফুলের মতো একরাশ প্রশান্তি অদৃশ্য কেউ যেন আমার অগোচরে ছড়িয়ে দিয়েছে আমার মনের প্রাঙ্গণে।

এই পূর্ণতার নামই কি পুণ্য? (সমাপ্ত)

✦ ──── ❦ ──── ✦
REFERENCE WIRE: আরও পড়ুন: মেঘমুলুকের আবছায়াতে (পর্ব-১)https://www.mrkhajuraho.com/post/6a7d560d77dff9cd19500fd9
Inspect Link ↗
DISPATCH WIRE:
Next Expeditions

Continue the Cultural Journey

✉ Correspondence Archive

Curator's Postbox

📬5 Letters on file
PEN YOUR LETTERYour thoughts become part of the permanent record
#01
রেজওয়ানা পারভীন
Jul 30, 2026

ভাইয়া, খুব সুন্দর হইসে। আনন্দ পাইসি। এবারের বার আমাগো বাংলাদেশ নিয়া কিসু ল্যাখেন। প্লিজ..🙏

EkalabyaJul 31, 2026

@রেজওয়ানা পারভীন শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত ভ্রমণ বৃত্তান্তটি পড়ার জন্য অশেষ ধন্যবাদ জানাই আপনাকে। চেষ্টা করব বাংলাদেশ নিয়ে কিছু লেখার।

#02
T
Titas Pramanick
Aug 1, 2026

Khub sundor hoyeche. Guti koyek bangla lekha. prottektai khub sundor.

EkalabyaAug 1, 2026

@Titas Pramanick অনেক ধন্যবাদ আপনাকে...🌻🌻

#03
C
Chandan Chowdhury
Aug 1, 2026

Bes valo

EkalabyaAug 2, 2026

@Chandan Chowdhury ধন্যবাদ 🌻

#04
M
Mrinal Kanti Bhuiyan
Aug 12, 2026

After completing 3 +1 writings by Mr. Ekalavya I can only say that you have a great talent of writing prose based on real events. I don't know how aged you are, but I'm 70+. All I can say that God Bless You. I like your writing. To the admin I want to say that please publish more writings in Bengali Language. Thank you.🙏

EkalabyaAug 13, 2026

@Mrinal Kanti Bhuiyan আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ। লেখাগুলো আপনার ভাল লেগেছে জেনে আনন্দিত হলাম। ভাল থাকবেন। সুস্থ থাকবেন।

AdminAug 13, 2026

@Mrinal Kanti Bhuiyan আরো একটা বাংলা লেখা প্রকাশিত হয়েছে, কয়েকটি পর্বে পুরো লেখাটি প্রকাশিত হবে। প্রথম পর্বটা পড়ার অনুরোধ রইলো🙏

#05
S
Supty
Aug 20, 2026

“Beautifully written! তুমি শুধু Varanasi-র জায়গাগুলো describe করোনি, বরং জায়গাটার soul-টাকেও লেখার মধ্যে তুলে ধরেছো। Loved reading every bit of it!”

AdminAug 20, 2026

@Supty ধন্যবাদ আপনাকে।🥰 অন্যান্য লেখাগুলো পড়ার অনুরোধ রইলো 🙏

AuthorAug 20, 2026

@Supty ধন্যবাদ। মন্তব্যটি অতীব সুন্দর। আপনার এই মন্তব্যটি আসলে এই লেখাটিকে সমৃদ্ধ করল। আমি বিশ্বাস করি, প্রতিটা স্থানেরই প্রাণ, মাধুর্য আছে। এবং সেই প্রাণকেই আমি ধরার চেষ্টা করি বা সেই মাধুরিকেই খোঁজার চেষ্টায় থাকি।

✦ END OF CORRESPONDENCE LEDGER — 5 LETTERS ON RECORD ✦
0%
READ
5